তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তীব্র সাংগঠনিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি কংগ্রেসে ফিরে আসার প্রস্তাব দিলেন কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। শুধু দলে ফেরার আবেদন নয়, বাংলায় মমতার নেতৃত্ব মেনে নিয়ে কংগ্রেস কাজ করতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবে রয়েছে একটি শর্ত—‘ব্যাগেজ’ ছেড়ে কংগ্রেসে ফেরার কথা বলেছেন অধীর। তাঁর এই মন্তব্যকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের শুরু কংগ্রেসেই। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তিনি অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে সেই দলই বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে কংগ্রেসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। সেই রাজনৈতিক ইতিহাসের পরেই অধীরের এই প্রস্তাব নতুন মাত্রা পেয়েছে।
অধীর চৌধুরীর বক্তব্য, এখন আর আলাদা রাজনৈতিক সত্তা ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। তাঁর দাবি, তৃণমূলের পরাজয়ের পর দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাকি সাংসদ ও বিধায়কদের নিয়ে কংগ্রেসে যোগ দিলে বাংলায় তাঁর নেতৃত্ব মেনে কাজ করতে আপত্তি নেই কংগ্রেসের। কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছেও এই প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তবে অধীরের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ তাঁর ‘ব্যাগেজ’ মন্তব্য। মমতাকে কংগ্রেসে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, অতীতের ঝামেলা এবং রাজনৈতিক ‘বোঝা’ পিছনে ফেলে আসতে হবে। সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদনে এই মন্তব্যকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রস্তাবটি নিছক দলবদলের আহ্বান নয়, এর সঙ্গে কংগ্রেসের কিছু রাজনৈতিক শর্তও জড়িয়ে রয়েছে।
প্রশ্ন হল, এই প্রস্তাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া কী হবে? এখনও পর্যন্ত তাঁকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে দেখা যায়নি। বরং ২ অক্টোবর তিনি INDIA জোটের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কথা বলেছেন। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের যৌথ কর্মসূচির প্রসঙ্গে মমতা জানিয়েছেন, এই লড়াই কোনও একক দলের সিদ্ধান্ত নয়, বিরোধী দলগুলি সম্মিলিত ভাবেই এগোচ্ছে।
অর্থাৎ, আপাতত মমতার রাজনৈতিক অবস্থান কংগ্রেসে ফিরে যাওয়ার কোনও প্রকাশ্য সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে—এমন তথ্য নেই। বরং INDIA জোটের মঞ্চে কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলির সঙ্গে সমন্বয়ের অবস্থানই প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে অধীরের প্রস্তাবকে এই মুহূর্তে কংগ্রেসের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার রাজনৈতিক আহ্বান হিসেবেই দেখা যাচ্ছে; এটিকে মমতার সিদ্ধান্ত বলে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।
অন্যদিকে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অবশ্যই এই প্রস্তাবের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সেপ্টেম্বরেই নির্বাচন কমিশন তৃণমূলের মূল নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরকে আলাদা নাম ও প্রতীক দিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক দেওয়া হয়। অন্য শিবির পায় ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘খাম’ প্রতীক।
এই নাম-প্রতীক বিতর্কের নিষ্পত্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দলের নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি করতে বলেছে। ফলে তৃণমূলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনি ও সাংগঠনিক লড়াইও একই সঙ্গে চলছে।
এই পরিস্থিতিতে অধীর চৌধুরীর প্রস্তাবের আর একটি দিক নজরে পড়ছে। কংগ্রেস শুধু মমতাকে দলে ফেরার কথা বলছে না, বাংলায় তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে কংগ্রেসের বাংলার সংগঠন এবং মমতার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
তবে এই মুহূর্তে কংগ্রেসে মমতার প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসেনি। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ও জানিয়েছেন, অধীর চৌধুরীর মন্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য; কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে তবেই তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি মমতার নেতৃত্বের প্রশ্নে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও স্পষ্ট করেছেন।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন কংগ্রেসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফিরবেন কি না, শুধু সেটি নয়। তৃণমূলের নাম-প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, INDIA জোটে মমতার ভূমিকা এবং কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলায় ভবিষ্যৎ সমীকরণ—এই চারটি বিষয়ই আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অধীর চৌধুরীর প্রস্তাব সেই সম্ভাব্য সমীকরণ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করেছে, কিন্তু মমতার পরবর্তী পদক্ষেপ এখনও তাঁরই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।



