নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের নির্বাচনী হলফনামা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবার কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court)। বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে তাঁর প্রার্থিপদ বাতিলের দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। বুধবার বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের এজলাসে বিষয়টি তোলা হয় এবং মামলা করার অনুমতি মিলেছে। বৃহস্পতিবার শুনানি হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে হাসিরানি রথের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামা। ১৫ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া ওই নথিতে তাঁর বয়স ৬০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। একই হলফনামার শিক্ষাগত যোগ্যতার অংশে ১৯৬৫ সালে মাধ্যমিক বা দশম শ্রেণির পরীক্ষা পাশ করার তথ্য রয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুই তথ্যকে সামনে রেখেই কংগ্রেসের প্রশ্ন, বয়স যদি ৬০ বছর হয়, তাহলে ১৯৬৫ সালে কীভাবে তিনি দশম শ্রেণি বা মাধ্যমিক পাশ করলেন? কংগ্রেসের বক্তব্য, নথিতে দেওয়া তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন এবং অভিযোগ সত্য হলে প্রার্থিপদ নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
শুধু পাশের বছর নিয়েই নয়, হলফনামায় যে স্কুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেই চৌখালি গঙ্গা পদ্মা মিলন কন্যা বিদ্যাপীঠ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। তাদের দাবি, ১৯৬৫ সালে ওই প্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণির অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা দরকার।
বিষয়টি নিয়ে এর আগে মঙ্গলবারই নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার হাসিরানি রথের হলফনামায় বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, বিষয়টি সামনে আসার পরও কমিশনের তরফে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এর পর বুধবার কলকাতা হাই কোর্টে বিষয়টি তোলেন কংগ্রেস নেতা তথা আইনজীবী ঋজু ঘোষাল। আদালতের কাছে তাঁর আবেদন, হলফনামায় দেওয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য ভুল প্রমাণিত হলে হাসিরানি রথের প্রার্থিপদ বাতিল করা হোক। দ্রুত শুনানির আর্জিও জানানো হয়। বিচারপতি কৃষ্ণ রাও মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তবে অভিযোগের পাল্টা ব্যাখ্যাও দিয়েছে বিজেপি। দলের দাবি, হাসিরানি রথের বয়স নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। হলফনামায় ১৯৬৫ সালের তথ্যটি মুদ্রণগত ভুল বলে দাবি করেছে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, হাসিরানি ১৯৮০ সালে দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেছিলেন।
বিজেপির তরফে হাসিরানি রথের একটি জন্মশংসাপত্রও সামনে আনা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই নথি অনুযায়ী তাঁর জন্ম ৮ জুন, ১৯৬৫। অর্থাৎ বিজেপির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতার জায়গায় ১৯৬৫ সালের উল্লেখটি ভুল; প্রকৃত শিক্ষাবর্ষ ১৯৮০।
হাসিরানির নির্বাচনী দফতরের তরফে আরও দাবি করা হয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট স্কুল থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, ওই সময় পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান অর্থে মাধ্যমিক পরীক্ষা চালু ছিল না। স্কুলের নথি থেকেই শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
এই ব্যাখ্যার সঙ্গে কংগ্রেসের অভিযোগের সরাসরি পার্থক্য রয়েছে। একদিকে বিরোধী পক্ষ হলফনামার তথ্যের সামঞ্জস্য নিয়ে তদন্ত চেয়েছে, অন্যদিকে বিজেপি বিষয়টিকে মুদ্রণগত ভুল বলে ব্যাখ্যা করেছে। ফলে আদালতে মূল প্রশ্ন হবে, হলফনামায় থাকা তথ্যের প্রকৃত অর্থ কী এবং সংশ্লিষ্ট নথিগুলির মধ্যে কোনও আইনি অসঙ্গতি রয়েছে কি না।
এর মধ্যেই নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের প্রস্তুতি এগোচ্ছে। ৬ অক্টোবর এই কেন্দ্রে ভোট হওয়ার কথা। ফলে প্রার্থীর হলফনামা নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি ভোটের আগে কীভাবে হয়, সেদিকেই নজর রয়েছে।
এখনও পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্ট হাসিরানি রথের হলফনামার তথ্য ভুল বলে কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি এবং তাঁর প্রার্থিপদ বাতিলেরও কোনও নির্দেশ হয়নি। ফলে আপাতত বিষয়টি অভিযোগ, পাল্টা দাবি এবং আদালতে উঠতে চলা শুনানির পর্যায়েই রয়েছে।



