২০২৩ সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে এবার মুখ খুললেন তৎকালীন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা (Rajiva Sinha)। তাঁর দাবি, ভোটের সময় রিগিং হয়েছিল বলে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। শুধু ভোটগ্রহণ নয়, ভোট গণনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছিল বলে জানিয়েছেন প্রাক্তন এই আমলা।
২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে। মনোনয়ন পর্ব থেকে ভোটগ্রহণ, এমনকী ফল প্রকাশের পরেও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে হিংসা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সেই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাজীব সিনহার সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
News18-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজীব সিনহা সরাসরি জানিয়েছেন, পঞ্চায়েত ভোটে রিগিং হয়েছিল বলে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। অর্থাৎ, নির্বাচন চলাকালীন যে অভিযোগগুলি রাজনৈতিক দলগুলির তরফে সামনে এসেছিল, সেগুলির অন্তত কিছু অংশ নিয়ে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের ভিতরেও প্রশ্ন ছিল—তাঁর বর্তমান বক্তব্য থেকে এমনটাই উঠে আসছে।
তবে রিগিং বলতে ঠিক কোন কোন ঘটনা বা কোন কোন কেন্দ্রে অনিয়মের কথা তিনি বোঝাচ্ছেন, তা নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কারণ ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ছিল বহুস্তরীয়—ভোটগ্রহণ থেকে গণনা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়েই রাজনৈতিক দলগুলি অভিযোগ তুলেছিল।
রাজীব সিনহার বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রসঙ্গ। News18-এর প্রতিবেদনে তাঁর সাক্ষাৎকারের মূল বিষয়গুলির মধ্যে প্রশাসনিক বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের ভোটের সময় রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টেও একাধিক মামলা হয়েছিল। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। সেই সময় প্রায় ৭৫ হাজার পঞ্চায়েত আসনে নির্বাচন হওয়ার কথা আদালতের নথিতেও উল্লেখ করা হয়েছিল।
ভোটের আগে থেকেই মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ভোটের দিন বুথ দখল ও রিগিংয়ের অভিযোগ এবং ফল ঘোষণার পর হিংসার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন রাজ্যের অন্যতম বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে রাজনৈতিক আলোচনায় ছিল। আদালতের নথিতেও নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক হিংসা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে উদ্বেগের উল্লেখ পাওয়া যায়।
রাজীব সিনহা সেই সময় রাজ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে গোটা প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন। ফলে কয়েক বছর পর তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ‘রিগিং হয়েছিল বলে নিশ্চিত ছিলাম’—এই বক্তব্য ২০২৩ সালের নির্বাচনের সময় ওঠা অভিযোগগুলিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
তবে তাঁর বর্তমান বক্তব্যকে ২০২৩ সালের প্রতিটি নির্বাচনী অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। কোথায় কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল এবং তার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও তার প্রমাণ আলাদাভাবে বিচার্য। রাজীব সিনহার বক্তব্য মূলত সেই সময়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও তাঁর উপলব্ধি সম্পর্কে।
প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্য সামনে আসার ফলে ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে পুরনো প্রশ্নগুলিই ফের সামনে এসেছে—ভোট পরিচালনার সময় প্রশাসন ও কমিশনের হাতে কতটা স্বাধীনতা ছিল, রাজনৈতিক চাপ কতটা কাজ করেছিল এবং ভোটগ্রহণ ও গণনা পর্বে ওঠা অভিযোগগুলির কতটা প্রশাসনের নজরে এসেছিল।



