নির্বাচন কমিশনাররা কি আইনের ঊর্ধ্বে? আজীবন রক্ষাকবচ নিয়ে কেন্দ্রকে নোটিস সুপ্রিম কোর্টের

২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় বর্তমান ও প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সেই বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে কেন্দ্রের জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের জন্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিধান নিয়ে কেন্দ্রের জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। ২০২৩ সালের আইনে থাকা এই বিশেষ রক্ষাকবচের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মামলায় বুধবার, ৪ নভেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) কাছে নোটিস পাঠিয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। মামলার মূল প্রশ্ন, দায়িত্ব পালনের অজুহাতে কোনও অন্যায় বা অপরাধের অভিযোগ উঠলেও কি বর্তমান ও প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চালানো যাবে না?

মামলাটি দায়ের করেছেন আইনজীবী ও সমাজকর্মী অরুণ কুমার আগরওয়াল। একই আইনি বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (Rashtriya Janata Dal) সাংসদ মনোজ ঝাও মামলা করেছেন। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার উপস্থিতিতে তিন বিচারপতির বেঞ্চ কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়েছে।

- Advertisement -

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act, 2023-এর ১৬ নম্বর ধারা। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনার পদে থাকাকালীন অথবা পদ ছাড়ার পরেও, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বা দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করার সময় করা কোনও কাজ, বলা কথা কিংবা পদক্ষেপের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা আদালত গ্রহণ বা চালিয়ে যেতে পারবে না।

অর্থাৎ, আইনের ভাষায় ‘is or was’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের ফলে এই সুরক্ষা শুধু কর্মরত কমিশনারদের জন্য নয়, প্রাক্তন কমিশনারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেই কারণেই আবেদনকারীদের বক্তব্য, এটি কার্যত আজীবন আইনি রক্ষাকবচ তৈরি করেছে। তবে এই বিধান সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য সাধারণ দায়মুক্তি—এমন নয়।

আবেদনকারীদের যুক্তি, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি হলেও তার অর্থ এই নয় যে কমিশনারদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে। অরুণ আগরওয়ালের আবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ নম্বর ধারায় সৎ উদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং অসৎ উদ্দেশ্যে বা ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে করা কাজের মধ্যে কোনও স্পষ্ট পার্থক্য রাখা হয়নি। ফলে দুর্নীতি, জালিয়াতি বা অন্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলেও এই ধারার কারণে আইনি পদক্ষেপ আটকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

মনোজ ঝার আবেদনের বক্তব্য, সংবিধানের ৩৬১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদের নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনারদের জন্য একই ধরনের আজীবন দায়মুক্তির কথা সংবিধানে নেই। তাঁর দাবি, সাধারণ আইন তৈরি করে এমন সুরক্ষা দেওয়া যায় কি না, তা সাংবিধানিকভাবে বিচার করা প্রয়োজন।

- Advertisement -

আবেদনকারীরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পক্ষপাত বা কমিশনের কোনও সিদ্ধান্তে নাগরিকের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ কতটা খোলা থাকবে। তাঁদের মতে, কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রেখেও ভিত্তিহীন মামলা আটকানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব; তার জন্য সব ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় এমন বিস্তৃত দায়মুক্তি প্রয়োজনীয় নয়।

এই বিধান নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। এর আগে লোক প্রহরী (Lok Prahari) এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (Association for Democratic Reforms বা ADR)-এর দায়ের করা আবেদনেও ১৬ নম্বর ধারার সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। অক্টোবরে ADR-এর আবেদনে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব চেয়ে মামলাটি একই বিষয়ে বিচারাধীন অন্য আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত।

এ দিনের শুনানিতে মনোজ ঝা ও অরুণ আগরওয়ালের আবেদনগুলিও বিচারাধীন মামলাগুলির সঙ্গে যুক্ত করার কথা জানিয়েছে বেঞ্চ। কেন্দ্রকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। আগামী ১৮ ডিসেম্বর বিষয়টি ফের শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

তবে সুপ্রিম কোর্ট এখনও ১৬ নম্বর ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি। কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য শোনার পরই এই বিধানের বৈধতা নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে। আপাতত ২০২৩ সালের আইনের এই ধারার সাংবিধানিক পরিধি এবং নির্বাচন কমিশনারদের জবাবদিহির প্রশ্নই আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর