ভোটার তালিকার খসড়ায় নাম নেই? আগে ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত থাকলেও এবার নতুন করে ফর্ম ৬ জমা দিয়ে তালিকায় নাম তোলার আবেদন করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট ভোটাররা। মঙ্গলবার এমনই গুরুত্বপূর্ণ স্পষ্টীকরণ দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। কমিশন জানিয়েছে, আগে ভোটার তালিকায় নাম ছিল বলে নতুন করে ফর্ম ৬ জমা দেওয়াকে মিথ্যা ঘোষণা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। শুধুমাত্র এই কারণে সংশ্লিষ্ট ভোটারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও করা যাবে না।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় খসড়া তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া বহু ভোটারের মধ্যে ফর্ম ৬ জমা দেওয়া নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কারণ, সাধারণত নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্যই এই ফর্ম ব্যবহার করা হয়। সেই বিভ্রান্তি দূর করতেই রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছে নির্দেশিকা পাঠিয়েছে কমিশন।
আগে ভোটার থাকলেও ফর্ম ৬ জমা দেওয়া যাবে?
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, এসআইআরের খসড়া ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম নেই, তাঁরা নতুন করে ফর্ম ৬ জমা দিয়ে চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম আগে কোনও ভোটার তালিকায় ছিল কি না, শুধু সেই কারণে আবেদন বাতিল করা যাবে না।
কমিশন আরও জানিয়েছে, আগে ভোটার হিসেবে নাম থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ফর্ম ৬ জমা দেওয়ার জন্য জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩১ নম্বর ধারায় কোনও আইনি পদক্ষেপ করা যাবে না। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। আবেদনকারীর নাম অন্য কোনও লোকসভা বা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় থাকা চলবে না। ফর্মে দেওয়া ঘোষণা এবং অন্যান্য তথ্যও আইন অনুযায়ী সঠিক হতে হবে।
এই নির্দেশের পিছনে রয়েছে দিল্লি হাই কোর্টের ১৪ অক্টোবরের একটি রায়। নীলতপল দত্ত ও অন্যদের দায়ের করা মামলায় আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, আগে ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও ফর্ম ৬ জমা দিতে গেলে প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম তোলার ঘোষণা দিতে হয়। এতে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তাঁরা।
দিল্লি হাই কোর্ট সেই আশঙ্কাকে গ্রহণ করেনি। আবেদনকারীরা চাইলে ফর্ম ৬ জমা দিয়ে আইন অনুযায়ী আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন বলে জানায় আদালত। এরপরই ৩ নভেম্বর রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছে নতুন করে নির্দেশ পাঠায় নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় ভাষায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বার্তা প্রচারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন অথবা তা শেষ হওয়ার পরেও ফর্ম ৬ জমা দিয়ে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করা যাবে। অর্থাৎ খসড়া তালিকায় নাম না থাকলে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নতুন করে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে ফর্ম জমা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাম তালিকায় উঠে যাবে, এমন নয়। আবেদনকারীর তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন বা এসএসআর (SSR) নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে সর্বদলীয় বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ফর্ম ৭-এর অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেন তৃণমূল, বাম ও কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা।
ফর্ম ৭ ব্যবহার করে কোনও ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আপত্তি জানানো যায়। কমিশনের ওয়েবসাইটেও ফর্মটিকে বিদ্যমান ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি এবং নাম বাদ দেওয়ার আবেদন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে তৃণমূলের কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেন, একজন ব্যক্তি একটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে একাধিক ফর্ম ৭ জমা দিতে পারলে তার অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হবে। তাঁর প্রশ্ন, একজন ব্যক্তি কীভাবে একটি কেন্দ্র থেকে ১০টি ফর্ম ৭ জমা দিতে পারেন? এর ফলে বহু ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে অথবা তাঁদের আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে ফর্ম ৭ জমা পড়লেই সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ যায় না। আপত্তির ভিত্তিতে নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের যাচাই ও নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। রাজনৈতিক দলগুলির আশঙ্কা এবং কমিশনের যাচাই প্রক্রিয়া—দু’টি বিষয়ই তাই গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত সূচি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এসএসআর প্রক্রিয়ার খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা ২৩ নভেম্বর ২০২৬। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর ২৩ নভেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জমা দেওয়া যাবে। সেই আবেদনগুলি নিষ্পত্তির নির্ধারিত সময়সীমা ৮ জানুয়ারি ২০২৭। এরপর ১৬ জানুয়ারি ২০২৭ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা।
ফলে খসড়া তালিকায় নাম না থাকলে নতুন করে আবেদন করার সুযোগ এবং ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া—দু’টি বিষয়েই সাধারণ ভোটারদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নিজের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করার পাশাপাশি কোনও আপত্তি বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট ফর্ম ও নিয়ম মেনে আবেদন করাই গুরুত্বপূর্ণ।



