এসআইআর (Special Intensive Revision) বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে? তা হলেও নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগ থাকছে। আগে ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও নতুন খসড়ায় নাম না থাকলে এবার ফর্ম ৬ পূরণ করে অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট ভোটাররা। মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের পাঠানো চিঠিতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। কমিশনের বক্তব্য, শুধুমাত্র আগে ভোটার তালিকায় নাম ছিল বলে ফর্ম ৬ জমা দেওয়াকে মিথ্যা ঘোষণা হিসেবে গণ্য করা হবে না। এই কারণে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩১ নম্বর ধারায় শাস্তিমূলক পদক্ষেপও করা হবে না।
এতদিন ফর্ম ৬ জমা দেওয়া নিয়ে সংশয়ে ছিলেন খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া বহু ভোটার। কারণ, এই ফর্মে আবেদনকারীকে ঘোষণা করতে হয় যে তিনি প্রথমবারের মতো ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করছেন। ফলে যাঁদের নাম আগের ভোটার তালিকায় ছিল, তাঁদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে নতুন করে আবেদন করলে আগের তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতি দেখা দিতে পারে। এমনকী, মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে আইনি সমস্যায় পড়তে পারেন বলেও ভয় ছিল। কমিশনের সাম্প্রতিক নির্দেশে সেই সংশয় অনেকটাই দূর হল।
ফর্ম ৬ নিয়ে কী জানাল নির্বাচন কমিশন?
কমিশনের ৩ নভেম্বরের চিঠিতে বলা হয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকা পুরনো ভোটাররাও ফর্ম ৬ জমা দিয়ে চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারবেন। আগে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত থাকা মাত্রই তাঁদের নতুন আবেদনকে মিথ্যা ঘোষণা বলা যাবে না।
তবে এই নির্দেশের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রয়েছে। আবেদনকারী অন্য কোনও লোকসভা বা বিধানসভা কেন্দ্রে ইতিমধ্যে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত থাকলে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। পাশাপাশি ফর্মে দেওয়া ঘোষণা এবং অন্যান্য আইনি শর্তও পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ, পুরনো ভোটারদের জন্য আবেদন করার সুযোগ তৈরি হলেও একাধিক কেন্দ্রে ভোটার হিসেবে নাম রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
কমিশন আরও জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের কথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের স্থানীয় ভাষায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন ফর্ম ৬ নিয়ে তৈরি হয়েছিল আইনি জটিলতা?
এসআইআর প্রক্রিয়ায় ফর্ম ৬-এর ব্যবহার এবং তার সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র নিয়ে আগেই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্ধারিত এই ফর্মে এসআইআর সংক্রান্ত অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। বিষয়টি নিয়ে আদালতেও মামলা হয়।
গত ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছিল, ফর্ম ৬-এর কোনও সংশোধনকে আদালত অনুমোদন করেনি। কে বা কারা এই পরিবর্তন করেছে, তা জানতে নির্বাচন কমিশনের কাছে নথিও চাওয়া হয়েছিল। ফলে ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন এবং তার আইনি বৈধতা নিয়ে বিতর্ক আরও গুরুত্ব পায়।
পরে ১৪ অক্টোবর দিল্লি হাই কোর্টের (Delhi High Court) একটি নির্দেশের বিষয়ও সামনে আসে। সেই নির্দেশের উল্লেখ করেই এবার নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগের ভোটার তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিরা খসড়া তালিকায় নাম না থাকলে ফর্ম ৬ জমা দিতে পারবেন। শুধুমাত্র এই কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও অব্যাহত
এদিকে এসআইআর প্রক্রিয়া এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, নাম বাদ পড়া এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির।
সম্প্রতি দিল্লির রামলীলা ময়দানে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী জোটের সভা হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগের প্রতিবাদে বিজেপিও বিভিন্ন জায়গায় কর্মসূচি পালন করেছে। কলকাতাতেও এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল।
এই রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের নতুন নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যাঁদের নাম আগের ভোটার তালিকায় ছিল, অথচ এসআইআরের খসড়া তালিকায় আর নেই, তাঁদের কাছে ফর্ম ৬ জমা দেওয়ার বিষয়টি এখন অনেকটাই স্পষ্ট। তবে আবেদন করলেই যে নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় উঠে যাবে, এমন নয়। আবেদনকারীর তথ্য ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



