আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে (US Midterm Elections 2026) বড়সড় রাজনৈতিক পালাবদল। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সেনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিনিয়ে নিল বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলিনা, সাউথ ক্যারোলিনা, কানসাস ও ওহাইওর মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। ফলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরে মার্কিন আইনসভার উচ্চকক্ষে বিরোধীদের বাধার মুখে পড়তে হবে প্রশাসনকে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, সরকারি সিদ্ধান্তের তদন্ত ও প্রশাসনের উপর নজরদারির ক্ষেত্রেও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা।
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ভোটের আগে মার্কিন সেনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুক্ত দুই নির্দলীয় সদস্য-সহ বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা ছিল ৪৭। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। ভোটের ফলাফলে সেই লক্ষ্য পূরণ করেছে তারা। ২০২০ সালের পর এই প্রথম ফের মার্কিন সেনেটের নিয়ন্ত্রণ পেল ডেমোক্র্যাটরা।
টেক্সাস থেকে নর্থ ক্যারোলিনা, একের পর এক আসনে ধাক্কা ট্রাম্পের
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলগুলির একটি টেক্সাসে। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই রাজ্যে সেনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। হারিয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে। ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম টেক্সাস থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মার্কিন সেনেটে নির্বাচিত হলেন। এই ফলকে মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নর্থ ক্যারোলিনাতেও রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রাক্তন গভর্নর রয় কুপার। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান নেতা মাইকেল হোয়াটলি। অন্যদিকে, সাউথ ক্যারোলিনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয়ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের প্রভাব থাকা এই রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য নির্বাচনের অন্যতম বড় ঘটনা।
ওহাইওতেও রিপাবলিকান প্রার্থী জন হুস্টেডকে পরাজিত করে সেনেটে ফিরেছেন প্রাক্তন ডেমোক্র্যাট গভর্নর শেরড ব্রাউন। কানসাসেও রিপাবলিকানদের আসন হারানোর ঘটনা ঘটেছে। ফলে একাধিক রাজ্যে ফলাফল রিপাবলিকানদের পক্ষে যায়নি।
জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য
শুধু রিপাবলিকানদের আসন ছিনিয়ে নেওয়াই নয়, নিজেদের দখলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলিও ধরে রেখেছে ডেমোক্র্যাটরা। জর্জিয়ায় জয় পেয়েছেন বর্তমান ডেমোক্র্যাট সেনেটর জন অসফ। নিউ হ্যাম্পশায়ারে রিপাবলিকান প্রাক্তন সেনেটর জন সুনুনুকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন ক্রিস পাপাস।
এই ফলাফলগুলির ফলে সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। ভোটের আগে ট্রাম্প নিজে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে একাধিক প্রচারসভায় অংশ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে যে রাজ্যগুলিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা ছিল, সেখানে দলের প্রার্থীদের হয়ে প্রচারে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রচার নির্বাচনী ফলাফলে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেনি।
সেনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কী সমস্যায় পড়বেন ট্রাম্প?
মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিভিন্ন উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও বিচারপতির নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সেনেটের ভূমিকা রয়েছে। ফলে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের হাতে উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্তে বাধা তৈরি হতে পারে।
এছাড়া সেনেটের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সরকারি কাজকর্মের তদন্ত, শুনানি আয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন পাঠানোর ক্ষমতাও রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের উপর নজরদারি বাড়াতে পারে। তবে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ এবং সেনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা—দুইয়ের রাজনৈতিক সমীকরণ আলাদা। আইন পাসের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে।
অন্যদিকে, সেনেটে ফিলিবাস্টারের নিয়মের কারণে অধিকাংশ সাধারণ আইন পাস করানো সহজ হবে না। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, এমন নয়।
ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের রাজনীতি কোন পথে?
এই নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচ, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ভোটের ফলাফলেও সেই বিষয়গুলির প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সেনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত হাউসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে নজর রয়েছে। তবে সেনেটের ক্ষমতা বদলের ফলে আগামী দু’বছর মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।



