ইরানে কি ফের হামলা চালাতে পারে আমেরিকা? সেই জল্পনার মধ্যেই নাগরিকদের পরমাণু বিস্ফোরণ হলে কীভাবে প্রাণ বাঁচাতে হবে, তা জানিয়ে একটি বিশেষ ভিডিও নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরানের সরকারি সংবাদসংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) গত ২৯ অক্টোবর প্রায় আট মিনিটের ওই ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে বেসমেন্টে আশ্রয় নেওয়া, জানালা থেকে দূরে থাকা এবং তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বা ‘ফলআউট’ থেকে বাঁচার মতো একাধিক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা কি আরও বাড়ছে? তবে নাগরিকদের জন্য এমন জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশিকা প্রকাশ করা মানেই যে পরমাণু হামলা আসন্ন, এমন কোনও প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। বরং ইরানের এই নির্দেশিকা প্রকাশের সময় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট ঘিরেই জল্পনা তৈরি হয়েছে।
পরমাণু বিস্ফোরণ হলে কী করতে হবে? ভিডিওতে কী নির্দেশ
ইরানের প্রকাশিত নির্দেশিকায় নাগরিকদের বলা হয়েছে, পরমাণু বিস্ফোরণের পরিস্থিতি তৈরি হলে যত দ্রুত সম্ভব শক্তপোক্ত কোনও ভবনের ভিতরে আশ্রয় নিতে হবে। বেসমেন্ট বা বাড়ির ভিতরের জানালাবিহীন ঘরকে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি বাইরের বাতাস ঘরের ভিতরে টেনে আনে, এমন এয়ার কন্ডিশনার ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেউ যদি বিস্ফোরণের সময় খোলা জায়গায় আটকে পড়েন, তাঁকে সরাসরি বিস্ফোরণের আলোর দিকে তাকাতে নিষেধ করা হয়েছে। কাছাকাছি নিরাপদ আশ্রয় না পেলে মাটির কাছাকাছি নেমে কোনও শক্ত আড়ালের পিছনে অবস্থান করতে এবং মাথা ও মুখ ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে নিকটবর্তী শক্তপোক্ত ভবনে ঢোকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্তত ২৪ ঘণ্টা আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ
বিস্ফোরণের পর বিপদ শেষ হয়ে গিয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণস্থল থেকে দূরের এলাকাতেও পৌঁছতে পারে। তাই অন্তত ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শের কথা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নির্দেশিকায় প্যাকেটজাত খাবার ও বোতলবন্দি জল ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। গাড়ির ভিতরে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ নয় বলেও সতর্ক করা হয়েছে। কারও পোশাক বা শরীরে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে বাইরের পোশাক সাবধানে খুলে আলাদা করে সিল করা ব্যাগে রাখতে এবং সাবান-জল দিয়ে শরীর ও চুল পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে।
কেন হঠাৎ এমন নির্দেশিকা প্রকাশ করল ইরান?
ইরানের এই ভিডিওটি প্রকাশ করেছে ইসফাহান প্রদেশের জরুরি পরিষেবা বিভাগ। ওই প্রদেশেই রয়েছে নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ‘প্যাসিভ ডিফেন্স উইক’-এর প্রেক্ষাপটে এই সচেতনতামূলক নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এর সময়কাল বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
গত ২০২৫ সালের জুনে ইজরায়েল ও আমেরিকার হামলায় ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই সময় ইরানের কর্তারা জানিয়েছিলেন, হামলার পর পারমাণবিক কেন্দ্রগুলির বাইরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর খবর পাওয়া যায়নি। এবার সরাসরি পরমাণু বিস্ফোরণ হলে কীভাবে বাঁচতে হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আমেরিকা কি সত্যিই পরমাণু হামলার পরিকল্পনা করছে?
ইরানের ভিডিও প্রকাশের সঙ্গে আমেরিকার সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে জল্পনার যোগ রয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ইরানের গভীরে অবস্থিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত পারমাণবিক-সম্পর্কিত স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। তবে সেই সময় তিনি পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নাকি ইরানে পরমাণু হামলার জন্য ট্রাম্পের উপর চাপ দিচ্ছেন। তবে এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এমন দাবিকে নিশ্চিত সামরিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ইউরোপেও কেন খাবার-জল মজুত রাখার পরামর্শ?
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার, পানীয় জল, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় নথি বাড়িতে মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালের মার্চেই অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেরা চলতে পারবেন, এমন জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখার কথা বলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেনেও পরিবারগুলিকে খাবার, জল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই নির্দেশিকাগুলিকে সরাসরি ইরান-আমেরিকা সংঘাত বা আসন্ন পরমাণু হামলার সঙ্গে যুক্ত করার প্রমাণ নেই। ইউরোপীয় দেশগুলির প্রস্তুতির মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি সাইবার হামলা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের আট মিনিটের ভিডিওটি মধ্যপ্রাচ্যের চলতি উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কিন্তু নাগরিকদের সতর্কতামূলক নির্দেশিকা প্রকাশ এবং বাস্তবে পরমাণু হামলার সিদ্ধান্ত—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আমেরিকার পক্ষ থেকে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কোনও নিশ্চিত ঘোষণা এখনও নেই।



