আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের (US Midterm Elections 2026) ভোটগণনা শুরু হতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান শিবিরের উপর চাপ বাড়ছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয় এবং রিপাবলিকানদের আসন হারানোর ঘটনায় ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলানোর ইঙ্গিত মিলছে। নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের মতো রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়াই করছে দুই দলই। শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও সিদ্ধান্তের উপর নজরদারির ক্ষমতা অনেকটাই বাড়বে তাদের।
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর আমেরিকায় ভোটগ্রহণ হয়েছে। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের (House of Representatives) ৪৩৫টি আসন এবং সেনেটের (Senate) ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে। পাশাপাশি একাধিক রাজ্যে গভর্নর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটগণনা শুরু হতেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয় সামনে আসে। বিশেষ করে উত্তর ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের দখলে থাকা সেনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়া বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উত্তর ক্যারোলাইনায় প্রাক্তন গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমগুলির নির্বাচনী পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। একইভাবে সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রিপাবলিকান ডারলিন গ্রাহামকে হারিয়েছেন। টেক্সাসেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর সাফল্য রিপাবলিকান শিবিরের কাছে বড় ধাক্কা। এই ফলাফলগুলি সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
তবে শুধু সেনেট নয়, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করছে। ফলে হাউসের নিয়ন্ত্রণও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের দলের সামনে। যদিও ভোটগণনা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও দলই নিশ্চিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দাবি করতে পারছে না।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে কী হবে ট্রাম্পের?
আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কংগ্রেসের দুই কক্ষের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে আইন প্রণয়ন এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের দলের সুবিধা হয়। কিন্তু বিরোধী দল কোনও একটি বা দুটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে প্রশাসনের উপর নজরদারি অনেকটাই বাড়াতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবে। সরকারি আধিকারিকদের শুনানিতে তলব, নথি চেয়ে সমন জারি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে কংগ্রেসের কমিটিতে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা তাদের হাতে আসবে। পাশাপাশি সরকারি খরচ ও বাজেট সংক্রান্ত সিদ্ধান্তেও বিরোধীদের ভূমিকা বাড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা তৈরি হতে পারে। প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও থাকবে। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই প্রেসিডেন্টের সমস্ত সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, কোনও বিল পাসের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। আবার সেনেটে ফিলিবাস্টারের নিয়মও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে উঠতে পারে।
বিদেশনীতি থেকে অর্থনীতি, নজর থাকবে ট্রাম্প প্রশাসনের উপর
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনীতি, মূল্যবৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশনীতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষের বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে বিদেশনীতি সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপরও নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে সামরিক পদক্ষেপ বা আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের অনুমোদন সংক্রান্ত নিয়মের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া নির্বাচনী ফলাফলে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি স্পষ্ট হলেও কংগ্রেসের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় আসেনি। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের একাধিক আসনে ভোটগণনা বাকি রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানরা নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে কি না, নাকি ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের কোনও একটির নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



