কাউকে থানায় বা তদন্তকারী সংস্থার হেফাজতে নেওয়ার পর আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেপ্তার দেখাতে দেরি করলেও আর বাদ যাবে না সেই সময়। আটকের মুহূর্ত থেকেই ২৪ ঘণ্টার হিসাব শুরু করতে হবে— এমনই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির না করালে তাঁর আটক বেআইনি বলে গণ্য হতে পারে এবং তাঁকে মুক্তি দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঞা (Justice Ujjal Bhuyan) এবং বিচারপতি অতুল এস চন্দুরকর (Justice Atul S Chandurkar)-এর বেঞ্চ জানিয়েছে, সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদে দেওয়া সুরক্ষা এড়াতে ‘আটক’ ও ‘গ্রেপ্তার’-এর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন করা যাবে না। পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার দেখানোর আগের সময়ও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গণনা করতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, কোনও ব্যক্তির স্বাধীনতা কার্যত কেড়ে নিয়ে তাঁকে তদন্তের প্রয়োজনে হেফাজতে রাখা হলে, সেই সময় থেকেই সাংবিধানিক সময়সীমা কার্যকর হবে। কেবল গ্রেপ্তারের কাগজে সময় লেখার পর থেকে ২৪ ঘণ্টা গণনা করার সুযোগ নেই।
সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে নিকটবর্তী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করতে হয়। আদালতে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় যাত্রার সময় এই হিসাবের বাইরে রাখা যায়। তবে জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত, তল্লাশি বা বাজেয়াপ্ত করার কাজে লাগা সময় বাদ দেওয়া যাবে না।
কেন এই নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত?
একটি মাদক পাচার মামলার শুনানিতে এই নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মামলায় চার অভিযুক্তকে ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো নাগাদ আটক করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা তাঁদের আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেপ্তার দেখায় পরের দিন, ৩০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়।
আদালতের হিসাব অনুযায়ী, আটক করার সময় থেকে ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টোর মধ্যে তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ফলে সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদের সুরক্ষা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে জানায় বেঞ্চ।
মামলাটিতে ১১.০৩ কেজি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের অভিযোগ ছিল। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক পদার্থ আইন (NDPS Act)-এর কঠোর জামিনের শর্ত থাকলেও সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারকে উপেক্ষা করা যায় না। আটক ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক নিয়ম ভাঙা হলে তার প্রভাব বিচার করতে হবে। ওই চার অভিযুক্তকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশও দেয় আদালত।
ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্যও নির্দেশ: শুধু পুলিশের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করেই থামেনি শীর্ষ আদালত। অভিযুক্তকে রিমান্ডে পাঠানোর আগে ম্যাজিস্ট্রেটকে আটকের প্রকৃত তারিখ ও সময় নথিভুক্ত করতে হবে। এরপর পরীক্ষা করতে হবে, আটক হওয়ার পর থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়েছে কি না।
এমনকি ২৪ ঘণ্টার সীমা অতিক্রম না করলেও আটকের সময় অযৌক্তিক দীর্ঘ বলে মনে হলে ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশি রিমান্ডের আবেদন খারিজ করতে পারেন। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita বা BNSS)-এর বিধানেও আটকের সময়কাল যুক্তিসঙ্গত রাখার বাধ্যবাধকতার কথা রয়েছে।
আদালতের এই নির্দেশের ফলে তদন্তের প্রয়োজনে কাউকে হেফাজতে রাখার ক্ষেত্রে পুলিশি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আটকের প্রকৃত সময়ও বিচারিক নজরদারির আওতায় আসবে।



