কলকাতা পুরসভার নির্বাচন এখনই হচ্ছে না। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুরভোটের কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে না রাজ্য নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার, ৬ নভেম্বর কলকাতা হাই কোর্টের অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চ এই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের বেঞ্চের এই নির্দেশের ফলে কলকাতা পুরসভার ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ল।
কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯ করার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন ওয়ার্ড বিন্যাসের ভিত্তিতে পুরভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি করা যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। অর্থাৎ, সিঙ্গল বেঞ্চে চলা মূল মামলার নিষ্পত্তির আগে কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করতে পারবে না রাজ্য নির্বাচন কমিশন।
১৪৪ থেকে ২০৯ ওয়ার্ড, কেন মামলা?
কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯ করার প্রক্রিয়া শুরু করে রাজ্য সরকার। গত ১১ সেপ্টেম্বর এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নতুন ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ এবং পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় আইন মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়নি।
ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন কসবার বাসিন্দা সিপিএমের দীপু দাস। তাঁর অভিযোগ, ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রশাসনিক সামঞ্জস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এমনকী, কোনও একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন মামলাকারী। তবে এগুলি মামলাকারীর অভিযোগ, আদালতে এখনও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।
সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন
প্রথমে মামলাটি হাই কোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চে ওঠে। বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য তখনই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেননি। পরিবর্তে রাজ্য সরকারকে চার সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাজ্যের বক্তব্যের পর মামলাকারীকে আরও দু’সপ্তাহের মধ্যে নিজের বক্তব্য জানাতে বলা হয়েছিল।
সিঙ্গল বেঞ্চের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যান মামলাকারী। তাঁর যুক্তি ছিল, ছয় সপ্তাহ ধরে হলফনামা আদানপ্রদানের প্রক্রিয়া চললে তার মধ্যে পুরভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বৈধতা নিয়ে দায়ের করা মামলাটি কার্যত গুরুত্ব হারাবে। সেই আশঙ্কা থেকেই দ্রুত হস্তক্ষেপের আর্জি জানানো হয়।
শুক্রবার সেই মামলাতেই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিল ডিভিশন বেঞ্চ। আদালত জানিয়েছে, সিঙ্গল বেঞ্চে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজ্য নির্বাচন কমিশন কলকাতা পুরসভার নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে না।
দুই পক্ষের কী যুক্তি ছিল আদালতে?
মামলাকারীর হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচিত পুরবোর্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুরসভা ভেঙে গেলে পুর কমিশনারের ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তা সত্ত্বেও পুর কমিশনার সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, নতুন ওয়ার্ড বিন্যাসে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজ্যের হয়ে সওয়াল করেন অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র। তাঁর বক্তব্য, নতুন ওয়ার্ড বিন্যাসের আগে খসড়া প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সময় সাধারণ মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কেউ আপত্তি জানাননি বলেই আদালতে দাবি করেন তিনি।
দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারির ক্ষেত্রে এই অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে কলকাতা পুরসভার ভোটের আগে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত আইনি জট কাটানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াল।
পুরভোট পিছোনোয় নাগরিক পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন
আদালতের নির্দেশ মেনে নেওয়া হলেও এর ফলে নাগরিক পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা বাড়তে পারে বলে মত সাংসদ সুকান্ত মজুমদারের। পুরসভার নির্বাচিত বোর্ড না থাকলে নাগরিক পরিষেবা ও প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
তবে আদালতের নির্দেশের অর্থ এই নয় যে কলকাতা পুরসভার নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল হয়ে গেল। আপাতত ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মূল মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে সিঙ্গল বেঞ্চে মামলার শুনানি ও পরবর্তী রায়ই ঠিক করবে কলকাতা পুরসভার নির্বাচন কবে হতে পারে।



