পুজোর প্রিভিউ পাস দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন মন্ত্রী তথা সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনকে (Indranil Sen) ঘিরে তদন্তে আরও তৎপর কলকাতা পুলিশ। এবার তাঁর কসবার বাড়ি এবং চন্দননগরের বাংলোয় তল্লাশি চালাল লালবাজারের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)। তদন্তকারীদের সঙ্গে দুই জায়গাতেই উপস্থিত ছিলেন ইন্দ্রনীল নিজে। অন্যদিকে, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছেন তাঁর মেয়ে আভেরি সেন। গোয়েন্দাদের কাছে তাঁর বক্তব্য, এই সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় তাঁর বাবা জানেন। তিনি নিজে কিছু জানেন না। একই মামলায় এর আগে ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মধুছন্দাও স্বামীর দিকেই দায় ঠেলেছিলেন বলে খবর।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রির ঘটনায় বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সেই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ নথি ইন্দ্রনীলের বাড়িতে থাকতে পারে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আসে। সেই সূত্র ধরেই শুক্রবার কসবার বহুতলে তাঁর বাড়িতে পৌঁছন লালবাজারের আধিকারিকরা। ইন্দ্রনীলকে সঙ্গে নিয়েই শুরু হয় তল্লাশি।
শুধু কসবার বাড়িতেই নয়, চন্দননগরে তাঁর বাংলোতেও নিয়ে যাওয়া হয় প্রাক্তন মন্ত্রীকে। সেখানেও বিভিন্ন নথিপত্র খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা। পুলিশের সূত্রের দাবি, দুই জায়গা থেকেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়েছে। সেগুলি খতিয়ে দেখে আর্থিক লেনদেনের গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা।
১৫০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতির প্রমাণ?
লালবাজারের এক আধিকারিকের দাবি, পুজোর প্রিভিউ পাস সংক্রান্ত মামলায় এখনও পর্যন্ত ১৫০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। তদন্তে ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠ তিনটি সংস্থার নাম উঠে এসেছে। ওই সংস্থাগুলির আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কিছু নথি তাঁর বাড়িতে রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
সেই নথির খোঁজেই কসবা ও চন্দননগরে তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। উদ্ধার হওয়া কাগজপত্রের মধ্যে কোন সংস্থার লেনদেনের তথ্য রয়েছে এবং তার সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রীর কী যোগ, তা খতিয়ে দেখছে SIT। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
জেরায় মেয়ের বক্তব্য, ‘বাবা সব জানেন’
এই মামলায় বৃহস্পতিবার লালবাজারে ডেকে পাঠানো হয়েছিল ইন্দ্রনীল সেনের মেয়ে আভেরি সেনকে। তাঁর নামে থাকা দুটি সংস্থার আর্থিক লেনদেন নিয়ে গোয়েন্দাদের একাধিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। তদন্তকারীদের নজরে এসেছে, ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠ একটি সংস্থা থেকে আভেরির ওই দুটি সংস্থায় প্রায় সাড়ে ২২ লক্ষ টাকা লেনদেন হয়েছিল।
কেন এই টাকা দেওয়া হয়েছিল, লেনদেনের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং পুজোর পাস বিক্রি ও পর্যটন দফতরের টেন্ডারের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা জানতে চান তদন্তকারীরা। পাশাপাশি তাঁর সংস্থাগুলির নথিপত্রও পরীক্ষা করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আভেরি জানিয়েছেন, তাঁর বাবা ইন্দ্রনীল সেন এই বিষয়ে সব কিছু জানেন। তাঁকে যে কাজ করতে বলা হয়েছিল, তিনি সেটাই করেছেন বলে দাবি করেছেন। ফলে ওই আর্থিক লেনদেনের পিছনে কারা ছিলেন এবং সিদ্ধান্তগুলি কে নিতেন, তা জানতে তদন্তের পরিধি আরও বাড়াচ্ছেন গোয়েন্দারা।
স্ত্রীর পর মেয়েও দায় ঠেললেন ইন্দ্রনীলের দিকে
উল্লেখযোগ্য বিষয়, এর আগে ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মধুছন্দাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন লালবাজারের গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, তিনিও তদন্তকারীদের কাছে দাবি করেছিলেন, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়গুলি তাঁর স্বামীই দেখাশোনা করতেন। তিনি এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানতেন না।
অর্থাৎ, একই মামলায় স্ত্রী ও মেয়ের বক্তব্যে ইন্দ্রনীল সেনের ভূমিকার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। তবে তাঁদের বক্তব্যই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আর্থিক নথি, ব্যাঙ্কের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ভূমিকা খতিয়ে দেখেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে পুলিশ।
‘শুভই কিংপিন’, দাবি ইন্দ্রনীলের
অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইন্দ্রনীল সেন দাবি করেছেন, ‘মাস আর্টে’র সেক্রেটারি ধ্রুবজ্যোতি বসু ওরফে শুভই সমস্ত আর্থিক লেনদেনের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, যাবতীয় টাকা-পয়সার হিসাব ও লেনদেন শুভর মাধ্যমেই পরিচালিত হত। এই ব্যক্তিকেই মূল চক্রের মাথা বা ‘কিংপিন’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
ইতিমধ্যেই ধ্রুবজ্যোতি বসু পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। ইন্দ্রনীলের এই দাবি কতটা সত্য, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, পুজোর পাস দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। দুর্নীতিদমন আইন (Prevention of Corruption Act) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারার প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কসবা ও চন্দননগর থেকে উদ্ধার হওয়া নথি এবং পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর।



