টেস্ট ক্রিকেট থেকে মহম্মদ শামির (Mohammed Shami) অবসরের ঘোষণায় ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু হয়েছে আলোচনা। দীর্ঘদিন জাতীয় টেস্ট দল থেকে বাইরে থাকার পর শুক্রবার রাতে লাল বলের ক্রিকেটকে বিদায় জানান বাংলার তারকা পেসার। তাঁর এই সিদ্ধান্তে মনখারাপ ভারতের বর্তমান বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের (Morne Morkel)। অন্যদিকে, শামির অবসরের জন্য নির্বাচকদের সিদ্ধান্তকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন ভারতের প্রাক্তন কোচ রবি শাস্ত্রী (Ravi Shastri)। তাঁর মতে, আরও অন্তত এক বছর টেস্ট ক্রিকেট খেলার সামর্থ্য ছিল শামির। এমনকী দেশের হয়ে আরও ৩০-৪০টি উইকেট নেওয়ার সুযোগও ছিল তাঁর সামনে।
শামির টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর খবর সামনে আসতেই তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত উইকেট নেওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁকে ভারতীয় টেস্ট দলে ফেরানো হল না, সেই প্রশ্ন উঠছে। ফিটনেসের কারণ দেখিয়ে তাঁকে বাইরে রাখা হয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু শাস্ত্রীর মতে, শামির পারফরম্যান্স ও মাঠে তাঁর পরিশ্রমই প্রমাণ করে যে আরও একটি সুযোগ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন এই পেসার।
শামির বিদায়ে আবেগপ্রবণ মর্নি মর্কেল
ভারতীয় দলের বর্তমান বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলও শামির অবসরে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। শামির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ভারতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর শামি তাঁকে মানিয়ে নিতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন।
মর্কেলের কথায়, শামির মতো দক্ষ বোলারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। ভারতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর ভাষা ও দলের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে শামির সহযোগিতা পেয়েছিলেন। দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন বাংলার এই পেসার।
শামির অবসরের সিদ্ধান্তে তাঁর খারাপ লাগলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে এখনও তাঁকে বল করতে দেখে ভালো লাগে বলে জানিয়েছেন মর্কেল। উল্লেখ্য, গৌতম গম্ভীর ভারতীয় দলের প্রধান কোচ হওয়ার পর তাঁর বোলিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পান মর্কেল। তাঁদের কোচিং পর্বে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতের সাফল্যের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন শামি। তবে সেই সময়ে আর টেস্ট দলে প্রত্যাবর্তন হয়নি তাঁর।
নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুললেন শাস্ত্রী
শামির টেস্ট কেরিয়ারের শেষটা আরও ভালো হতে পারত বলে মনে করেন রবি শাস্ত্রী। তাঁর কোচিংয়েই ভারতীয় টেস্ট দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেসার হয়ে উঠেছিলেন শামি। তাই এই বিদায়ে স্বাভাবিকভাবেই হতাশ প্রাক্তন কোচ। নির্বাচকদের ফিটনেস সংক্রান্ত যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
শাস্ত্রীর বক্তব্য, শামির ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বাংলার হয়ে কীভাবে নিয়মিত ১৫ থেকে ২০ ওভার বল করছেন তিনি? একজন ক্রিকেটার নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে আর কী করতে পারেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন প্রাক্তন ভারতীয় কোচ।
তাঁর মতে, শামিকে আরও একটি সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। অন্তত এক বছর টেস্ট ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল এই পেসারের। সেক্ষেত্রে ভারতের হয়ে আরও ৩০ থেকে ৪০টি উইকেট নেওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। এত ভালো একজন বোলারকে এভাবে টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে যেতে দেখে তিনি হতাশ বলেও জানিয়েছেন।
২০১৩ সালে অভিষেক, টেস্টে ২২৯ উইকেট
২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল মহম্মদ শামির। ভারতীয় টেস্ট দলের ২৭৯ নম্বর ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘতম ফরম্যাটে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন বাংলার এই ক্রিকেটার।
২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২৩ সালের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজে তাঁর পারফরম্যান্স ভারতীয় ক্রিকেটে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে তাঁর সিম ও সুইংয়ের দক্ষতা প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের বারবার সমস্যায় ফেলেছে। ৬৪টি টেস্ট ম্যাচে শামির সংগ্রহ ২২৯টি উইকেট। দীর্ঘদিন চোটের সমস্যায় ভুগলেও প্রত্যাবর্তনের পর নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় টেস্ট দলে আর জায়গা হচ্ছিল না তাঁর। নির্বাচক প্রধান অজিত আগরকরের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটির সিদ্ধান্তে টেস্ট দলে প্রত্যাবর্তন অধরাই থেকে যায়। ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফরম্যান্স সত্ত্বেও জাতীয় দলের দরজা না খোলায় তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
সাদা বলের ক্রিকেটে কি দেখা যাবে শামিকে?
টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিচ্ছেন না মহম্মদ শামি। নিজের বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, সাদা বলের ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাবেন। ফলে বাংলার হয়ে সীমিত ওভারের ক্রিকেট এবং ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (IPL) তাঁকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।
তবে বাংলার হয়ে আগামী দিনে রনজি ট্রফি খেলবেন কি না, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও ঘোষণা নেই। বাংলার পরবর্তী রনজি ম্যাচের সূচি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ফলে ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেটেও তাঁকে দেখা যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
টেস্ট ক্রিকেটে ২২৯ উইকেট নিয়ে শামির এই বিদায় ভারতীয় পেস আক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিন্তু তাঁর অবসরের পর রবি শাস্ত্রীর মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, অভিজ্ঞ এই পেসারকে কি আরও একবার টেস্ট দলে সুযোগ দেওয়া যেত?



