প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে এবার তাঁর মেয়ে আভেরি সেনকে ঘিরে খোঁজখবর শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police)। তদন্তকারীদের নজরে আভেরির সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং কয়েকটি সন্দেহজনক লেনদেন। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একাধিক নোটিসের পর বৃহস্পতিবার লালবাজারে হাজির হয়েছেন তিনি। তবে বৃহস্পতিবার তাঁর হাজিরার বিষয়টি এখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি; বুধবার পর্যন্ত একাধিক সংবাদসূত্রে তাঁর অনুপস্থিতির খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
লালবাজার সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আভেরির সঙ্গে যুক্ত দুটি সংস্থা—আইস্কেপ (iScape) এবং মায়রা (Mayra)—এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেনের সূত্র পেয়েছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগ, ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে ওই সংস্থাগুলির অ্যাকাউন্টে টাকা গিয়েছিল। সেই অর্থের উৎস কী, কোন কাজের বিনিময়ে টাকা পাঠানো হয়েছিল এবং পরে সেই টাকা কোথায় গিয়েছে, তা জানতে চাইছেন গোয়েন্দারা।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের কোনও অংশ এই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি দফতরের কাজ বা টেন্ডার সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে ওই সংস্থাগুলির কোনও যোগ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায়। তবে আভেরির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন; তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনও তথ্য নেই।
এর আগে মঙ্গলবার ও বুধবার লালবাজারে হাজিরা এড়িয়েছিলেন আভেরি। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রথমে সময় চেয়েছিলেন তিনি। বুধবারও হাজির না হওয়ায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে নতুন নোটিস দেয় পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টোর মধ্যে তাঁকে হাজির হতে বলা হয়েছিল।
এই মামলায় এর আগে ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী মধুছন্দা সেনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারীরা। স্বামী-স্ত্রীকে মুখোমুখি বসিয়েও জেরা করা হয়েছে বলে সংবাদসূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে কিছু বিষয়ে অমিল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তদন্তের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিটের (SIT) সদস্য সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। প্রথমে পাঁচ সদস্যকে নিয়ে দল গঠন করা হলেও পরে আরও চারজন আধিকারিককে যুক্ত করা হয়। ফলে বর্তমানে তদন্তকারী দলের সদস্য সংখ্যা ন’জন। পুজোর পাস বিক্রির অভিযোগের পাশাপাশি পর্যটন দফতরের বিভিন্ন কাজের বরাত এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কেন গ্রেফতার হয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন?
দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রিতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ২৮ অক্টোবর কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ গ্রেফতার করে প্রাক্তন মন্ত্রী তথা গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে। তার আগে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (Enforcement Directorate বা ED) দফতরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সেখান থেকে বেরনোর পরই কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দারা তাঁকে আটক করে লালবাজারে নিয়ে যান। পরে গ্রেফতার করা হয়।
মামলার সূত্রপাত বৌবাজার থানায় দায়ের হওয়া একটি অভিযোগ থেকে। অভিযোগকারী জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের দাবি ছিল, ‘মাস আর্ট’ (MassArt) নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রি করা হয়েছিল। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই কার্যকলাপে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ। ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রী অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এখন আভেরির সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির আর্থিক লেনদেনের নথি এবং তাঁর বয়ান মিলিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা। ওই লেনদেনের সঙ্গে পুজোর পাস বিক্রি বা সরকারি কাজের অর্থের কোনও যোগ পাওয়া যায় কি না, তার উপরই তদন্তের পরবর্তী দিক নির্ভর করছে।



