বাংলার নতুন শিল্পনীতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ছাড়, ১০ বছর পর্যন্ত মিলবে ইপিএফের টাকা ফেরত

বাংলার নতুন শিল্পনীতিতে যোগ্য এমএসএমই সংস্থার মহিলা ও রূপান্তরকামী কর্মীদের ইপিএফে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি সহায়তার প্রস্তাব। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পের প্রসারে একাধিক আর্থিক সুবিধা ঘোষণা রাজ্যের।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করে বিনিয়োগ টানার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে একাধিক আর্থিক সুবিধার কথা জানাল রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের ঘোষিত নীতিতে মহিলা ও রূপান্তরকামী কর্মীদের নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পে (MSME) নিয়োগকর্তার জমা দেওয়া প্রভিডেন্ট ফান্ডের (EPF) নির্দিষ্ট অংশ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ মাশুল ও জমির স্ট্যাম্প ডিউটিতেও ছাড়ের প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন নীতির লক্ষ্য শুধু নতুন বিনিয়োগ আনা নয়, রাজ্যের পিছিয়ে পড়া এলাকায় শিল্পের প্রসার এবং বন্ধ বা রুগ্ন কারখানাকে ফের চালু করার পথ তৈরি করাও। তবে ঘোষিত সুবিধাগুলি পেতে সংস্থাগুলিকে নির্দিষ্ট কর্মীসংখ্যা, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন শুরুর মতো শর্ত পূরণ করতে হবে।

- Advertisement -

নতুন নীতিতে ইপিএফের সুবিধার ক্ষেত্রে কর্মীদের লিঙ্গ ও শিল্পের ধরন অনুযায়ী আলাদা কাঠামো রাখা হয়েছে। প্রকাশিত নীতির বিবরণ অনুযায়ী, যোগ্য এমএসএমই সংস্থায় পুরুষ কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তার ইপিএফ জমার ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে। মহিলা ও রূপান্তরকামী কর্মীদের ক্ষেত্রে সেই হার ১০০ শতাংশ। তবে এই সুবিধার বার্ষিক ঊর্ধ্বসীমা প্রতি ইউনিটে ৫ কোটি টাকা।

বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রেও থাকছে ইপিএফে সরকারি সহায়তা। পাঁচ বছর পর্যন্ত নিয়োগকর্তার ইপিএফ জমার ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে অগ্রাধিকার এলাকায় সরাসরি অন্তত ২০০ জন এবং অন্য এলাকায় অন্তত ৪০০ জন কর্মী নিয়োগের শর্ত পূরণ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহায়তার সীমা ১০ কোটি টাকা। শিল্প পার্ক বা ক্লাস্টারে ১০০-র বেশি মহিলা কর্মী থাকলে কর্মজীবী মহিলাদের হস্টেল তৈরির জন্যও অনুদানের কথা বলা হয়েছে।

শুধু কর্মসংস্থান নয়, গবেষণা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে চাইছে সরকার। যোগ্য সংস্থার গবেষণা ও উন্নয়ন পরিকাঠামো তৈরির খরচের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে। ১০০ শতাংশ রফতানিমুখী ইউনিটের ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ শতাংশ হতে পারে, তবে সর্বোচ্চ অনুদান ৫ কোটি টাকা। গবেষণাগার, পরীক্ষামূলক উৎপাদন, পণ্য উন্নয়ন, প্রোটোটাইপ তৈরি এবং মেধাস্বত্ব তৈরির মতো কাজ এই সহায়তার আওতায় আসতে পারে।

বিদ্যুৎ সংক্রান্ত ছাড়, সুদে ভর্তুকি, রাজ্য জিএসটি-ভিত্তিক সহায়তা, জমির স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি-তে ছাড় এবং প্রযুক্তির উন্নয়নেও আর্থিক সুবিধার কথা রয়েছে। তবে কোন সংস্থা কতটা সুবিধা পাবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের ধরন, অবস্থান এবং নীতিতে নির্ধারিত যোগ্যতার উপর।

- Advertisement -

শিল্পনীতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, গ্রিন হাইড্রোজেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, জাহাজ নির্মাণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বস্ত্র, ওষুধ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রকে। ডেটা সেন্টার, বিশেষ ইস্পাত, পেট্রোকেমিক্যালস, রত্ন ও গয়না শিল্প এবং মাল্টি-মোডাল লজিস্টিকস পার্ককেও কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সব শিল্পকে এই সুবিধার আওতায় রাখা হচ্ছে না। স্পঞ্জ আয়রন, চিরাচরিত ইটভাটা, অ্যাসবেস্টস-ভিত্তিক উৎপাদন, নিষিদ্ধ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, তামাকজাত পণ্য, কয়লা প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজি তৈরির মতো কিছু শিল্পকে সরকারি প্রণোদনার বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে।

নতুন শিল্পনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থা। একটি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তথ্য, আবেদন, সরকারি অনুমোদন, আর্থিক সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ পাবেন। প্রকল্পের আবেদন থেকে অনুমোদন ও টাকা পাওয়ার প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক রাখার প্রস্তাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও রাজ্য সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করবে।

 

নীতিতে সিঙ্গল উইন্ডো পোর্টালকে বিনিয়োগকারীদের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম করার কথা বলা হয়েছে। তবে আপনার দেওয়া তথ্যে উল্লেখিত ৩০ দিনের মধ্যে সার্টিফিকেট অব ইনটেন্ট, উৎপাদন শুরুর পর ৪৫ দিনে সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি এবং দাবি মঞ্জুরির পর ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পাঠানোর সময়সীমা প্রকাশিত বিবরণে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। একইভাবে, মহিলা কর্মীদের জন্য ২০০-র বেশি কর্মী থাকা ইউনিটে ৭৫ শতাংশ ইপিএফ ফেরতের দাবি এবং ১০ বছর পর্যন্ত সুবিধার বিষয়টিও সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেখে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে প্রণোদনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা স্পষ্ট। তবে এই ঘোষণার বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে চূড়ান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতার শর্ত এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুবিধা বাস্তবে পৌঁছে দেওয়ার উপর।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর