সংবাদসংস্থা AP-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে, কারাবন্দি করা হতে পারে, এমনকী প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে। তবু নিজের দেশে, নিজের মানুষের কাছেই ফিরতে চান তিনি। তবে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট দিন, সময় কিংবা কীভাবে ফিরবেন, তা এখনও জানাননি আওয়ামী লীগ নেত্রী।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায়, “মৃত্যু যদি আমার ভাগ্যে লেখা থাকে, তবে নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষের মাঝেই মরতে চাই।” তাঁর বক্তব্য, দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন হয়নি। বুধবার ইমেলের মাধ্যমে AP-র পাঠানো প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে আসেন শেখ হাসিনা। তারপর থেকে তিনি ভারতেই রয়েছেন। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। রাষ্ট্রসংঘের একটি প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হিংসায় প্রায় ১,৪০০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল।
এই ঘটনায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়। হাসিনা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছে। তবে এখনও তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়নি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি এবং দলটির রাজনৈতিক কার্যকলাপের উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কার সঙ্গে কি হাসিনার ফেরার যোগ রয়েছে?
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এবং হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা একই সময়ে সামনে এসেছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ফলে মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে হার মানেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ হারানো নয়। তিনি এখনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
অন্যদিকে, হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা এর আগেও একাধিকবার জানিয়েছেন। আগস্টে দিল্লিতে এক সাংবাদিক বৈঠকে এবং সেপ্টেম্বর মাসে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন তিনি। অক্টোবরে ফের সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। ফলে ৫ নভেম্বরের AP সাক্ষাৎকারকে নতুন করে সিদ্ধান্ত ঘোষণার চেয়ে আগের অবস্থানেই অনড় থাকার বার্তা হিসেবে দেখা যায়।
তাঁর দেশে ফেরার পরিকল্পনার সঙ্গে মার্কিন নির্বাচনের ফলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনও তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। একইভাবে, ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়ের কারণে বাংলাদেশে জামাত বা অন্য রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে, কিংবা হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পথ সহজ হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার কথা বললেও শেখ হাসিনা কীভাবে ফিরবেন? তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বদলেছে। প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের অবস্থান এবং দেশে ফেরার পর আইনি পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে তাঁর ঘোষণার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে একাধিক বিষয়ের উপর। AP-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অবশ্য ফেরার নির্দিষ্ট দিন বা পথ জানাননি হাসিনা।



