নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (JFK) বিক্ষোভের মুখে পড়লেন বাংলাদেশের প্রাক্তন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার, ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে তাঁকে ঘিরে ধরে কয়েকজন স্লোগান দেন বলে ভিডিওতে দেখা গিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ তাঁকে ‘টেররিস্ট’ বলে সম্বোধন করেন এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র, গ্রেফতার ও হিংসার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে এই ঘটনার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ইউনূস হুইলচেয়ারে বসে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কয়েকজন সহকারী ও নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। সেই সময় কয়েকজন তাঁর কাছে এসে উচ্চস্বরে নানা অভিযোগ করেন। তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘হোয়াই ইউ কাম হিয়ার?’ অর্থাৎ, ‘আপনি এখানে কেন এসেছেন?’ অন্য কয়েকটি কণ্ঠে ‘ইউ আর আ টেররিস্ট’ এবং ‘ইউ আর আ থিফ’ বলেও স্লোগান শোনা যায়।
তবে ভিডিওতে ওঠা অভিযোগগুলিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিক্ষোভকারীদের পরিচয় এবং ঘটনার সম্পূর্ণ পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ইউনূস বা তাঁর প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের একাংশ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, সে দেশে হিংসা, গ্রেফতার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এক বিক্ষোভকারীকে বাংলাদেশে পুলিশকর্মীদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলতেও শোনা যায়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। ওই বছরের ৮ অগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর প্রশাসনের সময় আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক হিংসা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে বিমানবন্দরে বিক্ষোভকারীদের তোলা প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভিডিওতে কয়েকজনকে ইউনূসের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতে দেখা গেলেও, তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর সংখ্যা বা কোনও ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করা যায় না। সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্ত, সরকারি তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য নথি ছাড়া এমন অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
মঙ্গলবার সকাল থেকে ভিডিওটি বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে ইউনূসকে ঘিরে ধরে বিক্ষোভকারীদের স্লোগান দিতে দেখা যায়। বিমানবন্দরে উপস্থিত অন্য কয়েকজন যাত্রীও ঘটনাটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন বলে ভিডিওতে দেখা গিয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের পরিচয় নিয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য নেই। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের আওয়ামী লীগ-সমর্থক বলে দাবি করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। বাংলাদেশের সরকারের তরফে বিদেশের মাটিতে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথাও জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ঘটনাটি নিয়ে ইউনূসের সমর্থক ও সমালোচকদের মধ্যে সমাজমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ একে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বিমানবন্দরে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ঘিরে ধরে হেনস্থা করার সমালোচনা করছেন। তবে সমাজমাধ্যমের মন্তব্য জনমতের পূর্ণাঙ্গ বা প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি নয়।
বিমানবন্দরের বিক্ষোভের খবর প্রকাশের সময়ই বাংলাদেশের গ্রামীণ কল্যাণের কর মামলা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা করের দাবি সংক্রান্ত আবেদন খারিজ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এর ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষে বকেয়া কর আদায়ের পথ খুলেছে।
গ্রামীণ কল্যাণ একটি অলাভজনক সামাজিক উদ্যোগ, যা মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের কর নির্ধারণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আদালতে আবেদন করেছিল। সেই আবেদন খারিজ করে কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণে কর ফাঁকি সংক্রান্ত কঠোর মন্তব্যও করা হয়েছে।
তবে এই কর মামলা এবং নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরের বিক্ষোভ দুটি পৃথক ঘটনা। কর সংক্রান্ত আদালতের রায়কে বিমানবন্দরের বিক্ষোভের কারণ হিসেবে দেখানোর মতো কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের সময় ইউনূসকে ঘিরে স্লোগান দেওয়া হলেও তাঁকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি নিরাপদে বিমানবন্দর ছেড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর বাংলাদেশের সরকার কী আইনি পদক্ষেপ নেয় এবং বিক্ষোভকারীদের পরিচয় সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর। আপাতত প্রকাশ্যে আসা ভিডিওতে মৌখিক বিক্ষোভ ও অভিযোগের ছবি দেখা গেলেও, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সম্পাদনা নোট: বিমানবন্দরের বিক্ষোভকে ‘মবের শিকার’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে প্রতিবেদকের নিজস্ব সিদ্ধান্তে বর্ণনা না করে, ভিডিওতে শোনা স্লোগান ও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। গ্রামীণ কল্যাণের কর মামলাটি পৃথক আইনি ঘটনা হিসেবে রাখা হয়েছে।




