হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন জলপথে ফের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ল। রবিবার, ১১ অক্টোবর ওমানের সোহার উপকূলের কাছে ভারতীয় নাবিক থাকা দুটি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে বলে খবর। এর মধ্যে একটি জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনায় দুই ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। অন্য জাহাজটিতেও হামলার পর আগুন লাগে বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (Ministry of External Affairs)। অবিলম্বে এই ধরনের হামলা বন্ধ করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের দাবি জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে শুধু নাবিকদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদে পণ্য পরিবহণও বাধার মুখে পড়ছে। হরমুজ অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ভারত।
কোন দুটি জাহাজে হামলা হয়েছে?
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্ত জাহাজ দুটির নাম এমটি পেট্রো ডলফিন (MT Petro Dolphin) এবং এমটি ভালথেরা (MT Valthera)।
নিকারাগুয়ার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এমটি পেট্রো ডলফিনে ড্রোন হামলা হয় বলে জানা গিয়েছে। জাহাজটিতে ১১ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ন’জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাঁরা নিরাপদ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। বাকি দু’জনের খোঁজে তল্লাশি চলছে।
অন্যদিকে, মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমটি ভালথেরা জাহাজে অজ্ঞাত কোনও প্রজেক্টাইল আঘাত হানে বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। এর জেরে জাহাজটিতে আগুন লাগে। ওই জাহাজে থাকা ১১ জন ভারতীয় নাবিকই নিরাপদ রয়েছেন বলে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে।
পেট্রো ডলফিনের দুই নিখোঁজ নাবিককে খুঁজে বের করতে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। ওমানের উপকূলরক্ষী বাহিনী এই কাজে যুক্ত রয়েছে। মাসকটে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসও ওমানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল জানিয়েছেন, নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধারকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
নিখোঁজ দুই নাবিকের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের সন্ধানে চলা তল্লাশিই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
১১ অক্টোবরের হামলার ঘটনায় কড়া নিন্দা জানিয়েছে নয়াদিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার উপরেও জোর দিয়েছে ভারত।
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যের মূল বার্তা, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। চলমান সংঘাতের অবসানে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনা ও কূটনীতির পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
ভারতের কাছে এই ঘটনা বিশেষ উদ্বেগের, কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে বহু ভারতীয় নাবিক কাজ করেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিপদের পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার করা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণের পথ এটি। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছয়।
ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে শুধু জাহাজের নিরাপত্তাই নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে। জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে পরিবহণের খরচ এবং তেলের বাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রদত্ত প্রতিবেদনে ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সেই বৃহত্তর উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক নৌনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে সর্বশেষ দুটি জাহাজে হামলার জন্য কারা দায়ী, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা সংগঠনকে দায়ী করার আগে তদন্তের ফল এবং সরকারি বিবৃতির জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হল নিখোঁজ দুই ভারতীয় নাবিকের সন্ধান এবং ওই অঞ্চলে কর্মরত অন্য নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভারতের তরফে হামলা বন্ধ, অবাধ নৌচলাচল এবং কূটনৈতিক সমাধানের যে দাবি জানানো হয়েছে, তা এই পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।



