ইতিহাস গড়ার হাতছানি ছিল সামনে। ঘরের মাঠে ইরাকের শক্তিশালী ক্লাব আল শোর্তার বিরুদ্ধে দুরন্ত শুরু করেছিল ইস্টবেঙ্গল। দু’বার এগিয়েও গিয়েছিল লাল-হলুদ শিবির। প্রথমার্ধে একের পর এক আক্রমণ, গোলের সুযোগ তৈরি এবং ডেভিডের জোড়া গোল—সব মিলিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ছিল ইস্টবেঙ্গলের হাতে। কিন্তু ফুটবলে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার খেসারত যে কতটা কঠিন হতে পারে, ফের তার প্রমাণ মিলল।
শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হারতে হল ইস্টবেঙ্গলকে। দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় আল শোর্তা। প্রথমার্ধে যে দল প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলেছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত জয় থেকে দূরে সরে গেল।
আল শোর্তার মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রথম একাদশ সাজাতে কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ছিল। ইরাকের ক্লাবটি সাত বিদেশি ফুটবলার নিয়ে মাঠে নেমেছিল। তাদের দলে ছিলেন বিশ্বকাপে খেলা গোলরক্ষকও। সেই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এডমুন্ড ও ডেভিডের মতো ভারতীয় ফুটবলারদের আক্রমণে ভরসা রেখেছিলেন হাবাস।
তরুণ স্ট্রাইকার ডেভিডের উপর কোচের আস্থা যে অমূলক ছিল না, ম্যাচের শুরুতেই তা বুঝিয়ে দেন তিনি। আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ডেভিডকে না খেলানো নিয়ে আগে সমালোচনা হয়েছিল। আল শোর্তার বিরুদ্ধে তাঁর পারফরম্যান্স সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিল।
ম্যাচের অষ্টম মিনিটেই এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। ডানপ্রান্ত থেকে আসা বল দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জালে পাঠান ডেভিড। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে চাপে ফেলে দেন তিনি। ঘরের মাঠে তখন লাল-হলুদ সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস।
তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ম্যাচের ১৪ মিনিটে গোল শোধ করে আল শোর্তা। খেলায় সমতা ফিরলেও আক্রমণের ঝাঁজ কমায়নি ইস্টবেঙ্গল। বরং একের পর এক সুযোগ তৈরি করে ইরাকি দলের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে তারা।
প্রথমার্ধের ৪০ মিনিটে ফের গোল করেন ডেভিড। রশিদের ব্যাকফ্লিক থেকে পাওয়া বলকে জালে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। আবারও এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। ম্যাচের পরিস্থিতি তখন লাল-হলুদ শিবিরের অনুকূলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
প্রথমার্ধে শুধু দু’টি গোল করেই থেমে থাকতে হত না ইস্টবেঙ্গলকে। আক্রমণের ধার এবং গোলের সুযোগ তৈরির নিরিখে আরও বড় ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি।
ডেভিড নিজেও আরও গোল করতে পারতেন। তাঁর সামনে এসেছিল একাধিক সুযোগ, কিন্তু সেগুলি কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। রামিরেজ এবং এডমুন্ডও গোলের সুযোগ নষ্ট করেন। ফলে প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখলেও ব্যবধান বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ফুটবলে গোলের সুযোগ তৈরি করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই প্রয়োজন সেগুলিকে কাজে লাগানো। ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রে সেই জায়গাতেই ঘাটতি থেকে যায়। ম্যাচের প্রথমার্ধে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেও প্রয়োজনীয় ব্যবধান তৈরি করতে না পারার প্রভাব পড়ে পরের অর্ধে।
দ্বিতীয়ার্ধে আল শোর্তা যে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে, সেই আশঙ্কা ছিল। মাঠে ফিরেই ইরাকের দলটি চাপ বাড়াতে শুরু করে। আর তার ফল মেলে দ্রুত।
ম্যাচের ৫১ মিনিটে আল সায়েদির গোলে সমতা ফেরায় আল শোর্তা। ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ তখন চাপে। সমতা ফেরার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ৫৩ মিনিটে ফের গোল করে ইরাকি দলটি। ফিডেলস কুকুর গোলে প্রথমবারের মতো ম্যাচে এগিয়ে যায় আল শোর্তা।
মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে দু’টি গোল হজম করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায় ইস্টবেঙ্গল। প্রথমার্ধে যে দল আক্রমণে দাপট দেখিয়েছিল, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সেই দলকেই রক্ষণ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়।
ফিডেলস কুকুর গোলটি আটকানোর সুযোগ গোলরক্ষক গিলের ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে ম্যাচের মোড় ঘোরানোর ক্ষেত্রে আল শোর্তার দ্রুত আক্রমণ এবং ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ সামলাতে না পারাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ডেভিডের দু’টি গোল ম্যাচের অন্যতম বড় ইতিবাচক দিক। শুরু থেকেই তাঁর গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ফিনিশিং প্রতিপক্ষকে সমস্যায় ফেলেছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্য দলকে জয় এনে দিতে পারল না।
ইস্টবেঙ্গলের সামনে সুযোগ ছিল আল শোর্তার বিরুদ্ধে স্মরণীয় জয় তুলে নেওয়ার। প্রথমার্ধের পারফরম্যান্স সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব বলেই মনে করাচ্ছিল। কিন্তু গোলের সুযোগ নষ্ট এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রক্ষণে দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে দাঁড়াল।
এই হার লাল-হলুদ শিবিরের কাছে হতাশার। কারণ, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সুযোগ তৈরি করেও ম্যাচ জেতা গেল না। ডেভিডের জোড়া গোল, প্রথমার্ধের আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং ঘরের মাঠের সমর্থন—কোনও কিছুই শেষ পর্যন্ত কাজে এল না।
ইস্টবেঙ্গলের জন্য এই ম্যাচের শিক্ষা স্পষ্ট: শুধু সুযোগ তৈরি করলেই হবে না, সেগুলিকে গোলে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রক্ষণে মনোযোগ ধরে রাখাও জরুরি। আল শোর্তার বিরুদ্ধে সেই দুই জায়গাতেই ঘাটতি থাকায় শেষ হাসি হাসল ইরাকের ক্লাব।




