এক গোলে পিছিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল (East Bengal FC)। ম্যাচের ৮৯ মিনিট পর্যন্ত সেই ব্যবধানই ছিল। তারপর যেন বদলে গেল পুরো চিত্রনাট্য। অতিরিক্ত সময়ে একের পর এক গোল করে কুয়েতের আল-আরাবিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু (AFC Champions League Two)-এর মূলপর্বে জায়গা করে নিল লাল-হলুদ। কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে এই দুরন্ত প্রত্যাবর্তনের পর স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস (Antonio López Habas)।
ডার্বিতে হার দিয়ে মরসুমের শুরুটা মোটেই স্বপ্নের মতো হয়নি। তার উপর এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-র মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথম পরীক্ষাতেই সামনে ছিল শক্তিশালী আল-আরাবি। কিন্তু সেই চাপকে পিছনে ফেলে বুধবার রাতে অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিল ইস্টবেঙ্গল। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে সমতা ফেরানোর পর অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় লাল-হলুদ।
জয় গুপ্তার হেডে শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানোর পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেই শুরু হয় ইস্টবেঙ্গলের আসল দাপট। মহম্মদ রশিদ, ডেভিড হমার এবং রোহিত দানুর গোলে ৪-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয়। এই ফলেই ২০২৬-২৭ মরসুমের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-র গ্রুপ পর্বের টিকিট পেয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল।
জয়ের পর হাবাসকে দেখে অবশ্য আগের সেই চেনা রাশভারী কোচকে মনে হয়নি। বরং সাংবাদিকদের সামনে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিলেন স্প্যানিশ কোচ। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি উল্টে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, এত হতাশ কেন? ইস্টবেঙ্গলের জয়ে ভারতীয় ফুটবলেরও সাফল্য এসেছে, তাই এই জয় উদযাপন করা উচিত—এমনই বার্তা দেন তিনি।
হাবাসের এই বদলে যাওয়া আচরণও নজর কেড়েছে। প্রায় ১২ বছর আগে কলকাতায় এসে অ্যাটলেটিকো দে কলকাতার দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে কঠোর, গম্ভীর এবং সংবাদমাধ্যম থেকে দূরত্ব বজায় রাখা কোচকে দেখা গিয়েছিল, বর্তমান ইস্টবেঙ্গল কোচ যেন তার থেকে অনেকটাই আলাদা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর মেজাজ, বদলেছে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও।
তবে ম্যাচের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের কারণ হিসেবে কোনও একটি মুহূর্তকে চিহ্নিত করতে রাজি নন হাবাস। তাঁর মতে, গোল না এলেও দলকে আক্রমণের তীব্রতা ধরে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। সংগঠিত থাকার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত গোলের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ফলেই ম্যাচের চিত্র বদলেছে।
প্রাক-মরসুম প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় না পাওয়াই ম্যাচের আগে তাঁর অন্যতম বড় চিন্তার কারণ ছিল বলে জানিয়েছেন হাবাস। এত কম প্রস্তুতিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচে দল কতটা নিজেদের মেলে ধরতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু মাঠে ফুটবলারদের মানসিকতা সেই আশঙ্কা অনেকটাই দূর করেছে।
হাবাসের মতে, জয়টি সহজ ছিল না। পুরো ম্যাচেই দুই দলের মধ্যে কৌশলগত লড়াই চলেছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগঠন ধরে রাখা এবং একই তীব্রতায় খেলে যাওয়াটাই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য তৈরি করেছে। বৃষ্টিভেজা ও আর্দ্র পরিবেশেও ফুটবলারদের লড়াই করার মানসিকতার প্রশংসা করেছেন তিনি।
ম্যাচের পরিস্থিতি সামলাতে হাবাস নিজেও যে বেশ চাপে ছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছে তাঁর কথাতেই। প্রবল আর্দ্রতার মধ্যে ম্যাচ চলাকালীন প্রায় আট বোতল জল খেয়েছেন তিনি। তবে সেই অস্বস্তিকর পরিবেশও ইস্টবেঙ্গলের প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
এএফসি-র এই জয় আপাতত ইস্টবেঙ্গলের আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে বলেই মনে করছেন হাবাস। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমন নাটকীয় জয় মরসুমের শুরুতেই দলের মানসিক শক্তি বাড়াবে। তবে এশিয়ার মঞ্চের আনন্দ বেশিদিন উপভোগ করার সুযোগ নেই। এবার লাল-হলুদ শিবিরের নজর ডুরান্ড কাপের দিকে।
অন্যদিকে, আল-আরাবির কোচ গোরান জর্জেভিচ (Goran Đorđević) দলের শেষ পর্বের পারফরম্যান্সে হতাশ। তাঁর মতে, নির্ধারিত সময়ের বড় অংশে দল ভালো খেললেও শেষ ৩০ মিনিটে ইস্টবেঙ্গলের সামনে কার্যত আত্মসমর্পণ করে তাঁর দল। শক্তিশালী রিজার্ভ বেঞ্চের অভাব এবং মনোসংযোগে ঘাটতিকে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি।
বৃষ্টিভেজা মাঠকে অবশ্য হারের অজুহাত হিসেবে দেখাতে চাননি আল-আরাবি কোচ। বরং বারবার একই ধরনের ভুল এবং ম্যাচের শেষদিকে কৌশলগত ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারানোতেই পরাজয়ের কারণ দেখেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ইস্টবেঙ্গল শেষ ৩০ মিনিটে কৌশলে বড় কোনও পরিবর্তন না আনলেও আল-আরাবি নিজেদের ভুলেই ম্যাচ হাতছাড়া করেছে।
আল-আরাবির জন্য এটি ছিল চলতি মরসুমের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ। মরসুম শুরুর আগে কয়েকটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেললেও এর আগে কোনও অফিসিয়াল ম্যাচে নামেনি কুয়েতের দলটি। সেই অভিজ্ঞতার ঘাটতিও শেষ দিকে দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন গোরান।
তবে প্রতিপক্ষ কোচও ইস্টবেঙ্গলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে এগিয়ে রেখেছেন। তাঁর চোখে ম্যাচের শেষ অংশে মানসিক দৃঢ়তা, বেঞ্চের বিকল্প এবং ভুলের সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষমতাতেই দুই দলের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। আর সেই পার্থক্যই এশিয়ার মঞ্চে ইস্টবেঙ্গলকে পৌঁছে দিল আরও এক ধাপ সামনে।
ডার্বির হার দিয়ে শুরু, তারপর আন্তর্জাতিক মঞ্চে ৪-১-এর ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন—মরসুমের শুরুতেই ইস্টবেঙ্গলের গল্পটা তাই বদলে গেল এক রাতেই। এবার সেই আত্মবিশ্বাস ডুরান্ড কাপে কতটা কাজে লাগে, সেটাই দেখার। তবে আপাতত হাবাসের দল ভারতীয় ফুটবলের জন্য এশিয়ার মঞ্চে একটি বড় বার্তা দিয়ে রাখল।



