ভারত গণতন্ত্রের জননী। দেশে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা বিতর্ক হয়, আলোচনায় উঠে আসে নানা মত ও দৃষ্টিভঙ্গি। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর দিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য, সংবাদমাধ্যমের বিস্তার এবং ডিজিটাল যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক আলোচনায় প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সরকারের ক্ষমতা ব্যবহারের উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, সরকারের হাতে ক্ষমতা থাকা মানেই নাগরিকদের ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল করে রাখা নয়। বরং নাগরিকদের নিজেদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করাই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য। এই ভাবনাকেই তিনি ‘পাওয়ার টু এমপাওয়ার’ বা ক্ষমতায়নের শক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোদি ভারতের গণতান্ত্রিক পরিবেশের উদাহরণ হিসেবে ভাষা, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ১০০টিরও বেশি ভাষা রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৮০ হাজার নিবন্ধিত সংবাদপত্র ও প্রকাশনা এবং এক হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতে ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটির বেশি করে। তাঁর মতে, এই বিস্তৃত ডিজিটাল পরিসর মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে মত প্রকাশ, আলোচনা এবং একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগ করে দিয়েছে।
মোদির বক্তব্যে উঠে আসে, গণতন্ত্রের আলোচনাকে শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। মানুষের মত প্রকাশ, তথ্যের আদানপ্রদান এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কের সুযোগও গণতান্ত্রিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বক্তৃতায় উল্লেখ করা সংখ্যাগুলি প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান; সেগুলির তথ্যসূত্র ও গণনার পদ্ধতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারের ভূমিকা নিয়ে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ক্ষমতার প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর। তাঁর বক্তব্য, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সম্পদের অধিকার যাঁদের হাতে রয়েছে, তাঁরা কীভাবে সেগুলি ব্যবহার করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মোদির কথায়, ক্ষমতা শুধু নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও ব্যবহার করা উচিত। একইভাবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করার উপর জোর দেন তিনি। ভারতের ঐতিহ্য থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে মোদি সরকারের কাজের একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন—নাগরিকদের শুধু সরকারি পরিষেবার গ্রাহক হিসেবে না দেখে তাঁদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করা। শিক্ষা, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রাপ্তি এবং ডিজিটাল যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রকে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ডিজিটাল প্রযুক্তির গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইন্টারনেট মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা এবং মতবিনিময়ের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে।
মোদির বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের সুবিধা পাওয়াও অনেকের কাছে বিশেষ সুযোগের বিষয় ছিল। এখন ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের ফলে আরও বেশি মানুষ তথ্য ও পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। প্রযুক্তির এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নাগরিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
তবে ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের সামগ্রিক মূল্যায়ন এক বিষয় নয়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বা সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা দিয়ে একা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা গণতন্ত্রের সমস্ত দিক বিচার করা যায় না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এগুলিকে ভারতের বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরাম অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করার একটি মঞ্চ। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোদি ভারতের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার উপরও জোর দেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, ভারত অন্য দেশের ক্ষতির বিনিময়ে এগোতে চায় না; বরং বিশ্বের সঙ্গে এবং বিশ্বের জন্য উন্নতির পথ তৈরি করতে চায়। সংস্কারকে বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সরকারের দৃঢ় বিশ্বাসের অংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, দিল্লির এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে মোদির বক্তব্যে গণতন্ত্র, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং নাগরিকদের ক্ষমতায়নের বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতের ভাষা ও সংবাদমাধ্যমের বৈচিত্র্যকে গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রেক্ষাপট হিসেবে তুলে ধরে তিনি প্রযুক্তির ব্যবহারকে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।




