গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে কড়া অবস্থানে দিল্লি! ১২ ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ, বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সমীকরণে কী চাইছে ভারত?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ফরাক্কা গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। তার আগে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পুরনো চুক্তির শর্ত মেনেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বাড়াতে রাজি নয় নয়াদিল্লি। ভারতের অবস্থান, নতুন কোনও সমঝোতা হলে দেশের অভ্যন্তরীণ জলসম্পদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জলপ্রাপ্তির বিষয়টিও আলোচনায় বিবেচনা করা হবে। ফলে চার দশকের পুরনো জলবণ্টন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সময় আসতে চলেছে।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন ভারত ও বাংলাদেশের সরকারের মধ্যে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর। সেই হিসাবেই ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চুক্তিতে স্বয়ংক্রিয় নবীকরণের কোনও ব্যবস্থা নেই। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই দেশকে নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

- Advertisement -

ভারতের তরফে পুরনো চুক্তি অপরিবর্তিত রেখে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে অনীহার কথা সামনে এসেছে। নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে গঙ্গার উজানে ভারতের জল ব্যবহারের প্রয়োজন, অভ্যন্তরীণ জলনিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের শুষ্ক মরসুমের চাহিদা—সবকটি বিষয় বিবেচনায় রাখার কথা বলা হচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে তিন দশকের পুরনো সমঝোতার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ফরাক্কা গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি (Ganges Water Sharing Treaty) ঘিরে এবার নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। পুরনো চুক্তির মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর পক্ষে নয় নয়াদিল্লি। ভারতের অবস্থান, নতুন কোনও সমঝোতা হলে দেশের অভ্যন্তরীণ জলসম্পদের চাহিদা ও উজানের রাজ্যগুলির স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে, শুষ্ক মরসুমে পর্যাপ্ত জল পাওয়ার নিশ্চয়তা চাইছে ঢাকা। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে জলবণ্টন নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিটি ৩০ বছরের জন্য কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এর নবীকরণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ একতরফাভাবে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, গঙ্গার জলবণ্টন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা দুই দেশের বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত। তবে নতুন চুক্তির মেয়াদ, জলবণ্টনের শর্ত এবং নিশ্চয়তার বিষয়গুলি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনও পার্থক্য রয়েছে।

- Advertisement -

চুক্তি নবীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দাবি হল শুষ্ক মরসুমে গঙ্গার জলপ্রাপ্তির নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের জলসম্পদমন্ত্রী শহিদউদ্দিন চৌধুরী আনে জানিয়েছেন, নতুন বা সংশোধিত চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের সমঝোতার মতো গ্যারান্টি ক্লজ ফিরিয়ে আনা তাঁদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

১৯৭৭ সালের চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ফরাক্কায় জলপ্রবাহ নির্ধারিত মাত্রার নীচে নেমে গেলে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ জলের অন্তত ৮০ শতাংশ সরবরাহের সুরক্ষা থাকবে। কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সেই একই ধরনের ৮০ শতাংশ নিশ্চয়তার ধারা নেই। বর্তমান চুক্তিতে জলপ্রবাহের পরিমাণ অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে জল ভাগ করার নির্দিষ্ট সূত্র রয়েছে।

বাংলাদেশের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুষ্ক মরসুমে গঙ্গার জল কৃষিকাজ, পানীয় জল এবং নদী নির্ভর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ জল পাওয়ার নিশ্চয়তা চাইছে ঢাকা।

চুক্তির মেয়াদ নিয়েও দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি জলবণ্টন ব্যবস্থার পক্ষে। অন্যদিকে, ভারতের ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি চুক্তির সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে বলে ৩১ অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ জলসম্পদের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের পানীয় জল, কৃষিকাজ, শিল্প এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জলের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি ফরাক্কা ব্যারাজের আশপাশে পলি জমার কারণে নদীর জলপ্রবাহের উপর যে প্রভাব পড়ছে, সেটিও নতুন জলবণ্টন কাঠামোয় বিবেচনার দাবি উঠেছে।

এদিকে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে সরব। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (National Citizen Party বা NCP) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জলবণ্টনের দাবির সঙ্গে ভারতের ট্রানজিট সুবিধার প্রসঙ্গ জুড়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশ ন্যায্য জল না পেলে ভারতীয় পণ্য পরিবহণের জন্য ট্রানজিট বা করিডর সুবিধা দেওয়ার বিরোধিতা করা উচিত। প্রয়োজনে ফের ফরাক্কা অভিমুখে লং মার্চের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ সরকারের আমলে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এইচ ডি দেবগৌড়া। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার নতুন করে জলবণ্টন নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি কমিটি গঠন করেছেন। জলসম্পদমন্ত্রী ও সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সেই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশের তরফে নিজেদের জলসম্পদের প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই আলোচনায় বসার প্রস্তুতি চলছে।

অন্যদিকে, ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, জলবণ্টন সংক্রান্ত আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমেই এগোবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে সফরের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হওয়ার খবর নেই।

সব মিলিয়ে, ১২ ডিসেম্বরের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ জলসম্পদের প্রয়োজন, অন্যদিকে বাংলাদেশের শুষ্ক মরসুমের জলপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই আগামী আলোচনার প্রধান চ্যালেঞ্জ। নতুন চুক্তি হবে, নাকি পুরনো ব্যবস্থার পরিবর্তিত কোনও রূপ সামনে আসবে, তার উপর নির্ভর করছে দুই প্রতিবেশী দেশের আগামী দিনের জল-কূটনীতির গতিপথ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর