ইউক্রেনের ত্রাণকেন্দ্রে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা! নিহত অন্তত ৪০, ধ্বংসস্তূপে আটকে ৫৯ জন

ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়ার কমিসুভাখা গ্রামের ত্রাণকেন্দ্রে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫৯ জন নিখোঁজ, উদ্ধারকাজ চলছে। আবুধাবিতে শান্তি বৈঠকের আগেই এই হামলা ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জাপোরিঝিয়া (Zaporizhzhia) অঞ্চলে একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে ভয়াবহ বিমান হামলার অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। কমিসুভাখা গ্রামের (Komyshuvakha) একটি স্কুলের বাঙ্কারে চালানো এই হামলায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। এখনও ৫৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাপোরিঝিয়ার আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সহ-প্রধান ইভান ফেদোরভ। যুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থল এবং খাবার বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ওই জায়গায় হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঘটনাটি সোমবার ঘটলেও সম্প্রতি হামলার বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কমিসুভাখা গ্রামের একটি স্কুলের বাঙ্কারকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। পাশাপাশি সেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছিল। সেই সময়েই পরপর দু’দফায় বোমাবর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ ইউক্রেনের।

- Advertisement -

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি (Volodymyr Zelenskyy) জানিয়েছেন, স্থানীয় বাসিন্দারা ত্রাণ নিতে ওই কেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন। প্রথম দফায় বোমা ফেলার পরেও দ্বিতীয় বার হামলা চালানো হয়। ফলে উদ্ধারকাজ চালানো এবং আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে বের করে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

উদ্ধারকাজে এখনও মিলছে দেহ, নিহত পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরাও

জাপোরিঝিয়ার আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সহ-প্রধান ইভান ফেদোরভের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও ৫৯ জনের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে নিখোঁজদের প্রত্যেকেই ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে রয়েছেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে।

সোমবার আন্তর্জাতিক খাদ্য সহায়তা সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন (World Central Kitchen)-এর উদ্যোগে ওই এলাকায় ত্রাণ বিতরণ চলছিল। হামলার জেরে প্রাণ হারিয়েছেন চার জন পুলিশকর্মী এবং দুই জন উদ্ধারকর্মীও। প্রথম দফার বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেছিলেন তাঁরা। সেই সময়েই ফের হামলা চালানো হয় বলে ইউক্রেনের অভিযোগ।

জাতিসংঘের ইউক্রেনের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন (UN Human Rights Monitoring Mission in Ukraine) জানিয়েছে, ২ নভেম্বর সকালে ওই স্কুলে একাধিক গ্লাইড বোমা আছড়ে পড়ে। হামলার আগের দিনই স্থানীয় প্রশাসনের তরফে সামাজিক মাধ্যমে সেখানে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণের কথা জানানো হয়েছিল। রাষ্ট্রসংঘের পর্যবেক্ষকদের মতে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের শক্তিশালী বোমার ব্যবহার ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটাতে পারে।

- Advertisement -

হামলায় নিহত এক পুলিশকর্মীর শরীরে লাগানো বডিক্যামের ফুটেজও সামনে এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, আকাশপথে হামলার সতর্কবার্তা পাওয়ার পর সাধারণ মানুষ দ্রুত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। কয়েক জনকে আশ্রয়স্থলের ভিতরে ঢুকতেও দেখা যায়। এর পরেই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে ক্যামেরার ছবি অন্ধকার হয়ে যায়।

ইউক্রেনের পুলিশের দাবি, হামলায় একাধিক বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। তার মধ্যে ছিল তিন টন ওজনের এফএবি-৩০০০ (FAB-3000) গ্লাইড বোমা, যাতে প্রায় ১.৪ টন বিস্ফোরক থাকতে পারে। তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, তাদের সেনাবাহিনী কমিসুভাখা ও সংলগ্ন এলাকায় ইউক্রেনের সামরিক ইউনিটকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। মস্কোর দাবি, ওই অভিযানে ইউক্রেনের ২৫ জন সেনার মৃত্যু হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে রাশিয়া। ফলে হামলার লক্ষ্য ও পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই হামলার সময়কালও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের ওলেশকি (Oleshky) থেকে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। সেই বিরতি শেষ হওয়ার পরের দিনই কমিসুভাখায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। মেলানিয়ার দাবি অনুযায়ী, ওই যুদ্ধবিরতির সময়ে প্রায় ৮০০ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

এদিকে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনায় যুদ্ধের অবসান, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উত্তেজনা প্রশমনের বিষয়গুলি গুরুত্ব পাবে।

শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই ত্রাণকেন্দ্রে এই প্রাণঘাতী হামলা সংঘাতের মানবিক মূল্যকে আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে নিখোঁজদের সন্ধানে এখনও চলছে উদ্ধার অভিযান।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর