রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে ছটপুজো ফের চালুর ভাবনা প্রকাশ্যে আসতেই আইনি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বুধবার রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) দুই সরোবরে ছটপুজোর সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন। পরিবেশকর্মীরা তাঁকে জাতীয় পরিবেশ আদালত (National Green Tribunal বা NGT), কলকাতা হাই কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশের কথা মনে করিয়ে দেন।
বুধবার সকালে কলকাতা ও হাওড়ার বিভিন্ন ছটঘাট পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অগ্নিমিত্রা জানান, এ বার রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো করতে দেওয়ার কথা ভাবছে রাজ্য সরকার। তাঁর বক্তব্য, এলাকার বাসিন্দারা কোথায় পুজো করবেন, সেই বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেন, সরোবরে পুজোর অনুমতি দেওয়া হলে পরিবেশের ক্ষতি আটকাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হবে। পুজো শেষে সমস্ত সামগ্রী জল থেকে তুলে নিতে হবে। জাতীয় পরিবেশ আদালতের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানান তিনি।
কিন্তু এই ঘোষণার পরেই পরিবেশকর্মীরা আদালতের নির্দেশের বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁদের বক্তব্য, রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে ছটপুজো বন্ধ রাখার নির্দেশ রয়েছে। সেই নির্দেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় রাজ্য সরকার কীভাবে নতুন করে অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবেশকর্মী নব দত্তের বক্তব্য, আদালতের নির্দেশ থাকার পরেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে পুজোর অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। অন্যদিকে, এই মামলার সঙ্গে যুক্ত পরিবেশপ্রেমী সুভাষ দত্তের বক্তব্য, সরোবরে ছটপুজো ফের চালু করতে হলে রাজ্য সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হবে।
কী বলছে আদালতের পুরনো নির্দেশ? রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। জলাশয়ের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির আশঙ্কায় ২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত (NGT) সেখানে ছটপুজোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরে সুভাষ সরোবরেও ছটপুজো বন্ধ রাখার নির্দেশ কার্যকর হয়।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রবীন্দ্র সরোবরের ভিতরে ছটপুজোর আয়োজনের ঘটনা ঘটে। এর পর বিষয়টি কলকাতা হাই কোর্টে যায়। ২০২০ সালে হাই কোর্টও নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। একই বছর রবীন্দ্র সরোবর নিয়ে রাজ্যের আবেদন শুনে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশে তারা কোনও পরিবর্তন করছে না।
পরিবেশ দূষণ নিয়ে উদ্বেগ: পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, ছটপুজোর সময় বিপুল মানুষের জমায়েত, পুজোর সামগ্রী জলে ফেলা, শব্দ ও আতশবাজির কারণে সরোবরের পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। পরিবেশকর্মী এস এম ঘোষের বক্তব্য, সরোবরের জল এখনও দূষণের সমস্যায় রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, নতুন করে বড় জমায়েত হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
অন্যদিকে, ছটপুজোর জন্য শহরের বিভিন্ন পুকুর ও গঙ্গার ঘাটে পরিকাঠামো তৈরির কথা জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা। ঘাটে অস্থায়ী রাস্তা, চেঞ্জিং রুম, বায়ো-টয়লেট, পর্যাপ্ত আলো, জরুরি যোগাযোগের নম্বর এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবক রাখার পরিকল্পনার কথা তিনি জানিয়েছেন। হুগলি নদীতে জোয়ারের সময় জলস্তরের পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে বলেছেন বলেও জানিয়েছে পিটিআই।
এ বছরের ছটপুজোর প্রধান অর্ঘ্য দেওয়া হবে ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় এবং ১৬ নভেম্বর সকালে। তার আগে রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে পুজোর অনুমতি দেওয়া নিয়ে রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তা নির্ভর করছে আদালতের নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের উপর। আপাতত মন্ত্রীর বক্তব্যে সরোবরে পুজোর চূড়ান্ত অনুমতির কথা স্পষ্ট হয়নি।



