ইন্দ্রনীল-মধুছন্দাকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা, পুলিশের সামনেই তর্ক! ‘এভাবে টাকা তুলতে নিষেধ করেছিলাম’ বললেন স্ত্রী

ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রির অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেন ও মধুছন্দাকে মুখোমুখি জেরা করল লালবাজার। এবার মেয়ের হাজিরা, পর্যটন দফতরের টেন্ডার এবং এমপিও আইনের ২ ও ৯ নম্বর ধারা যুক্ত করার প্রস্তুতি ঘিরে তদন্তে নতুন দিক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দুর্গাপুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রিকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন তথ্য। এবার কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করল। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, জেরার সময় দু’জনের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এমনকি পুলিশের সামনেই টাকা তোলার পদ্ধতি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তর্ক শুরু হয়। মধুছন্দার দাবি, তিনি এভাবে টাকা সংগ্রহ করতে ইন্দ্রনীলকে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আপত্তি শোনা হয়নি।

ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শোয়ের পাস বিক্রির অভিযোগে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন ইন্দ্রনীল। এই মামলায় তাঁর স্ত্রী মধুছন্দার ভূমিকাও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। ‘মাস আর্ট’ (Mass Art) সংস্থার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আর্থিক লেনদেন ও সংস্থার কাজকর্ম সম্পর্কে তিনি কতটা জানতেন, সেই বিষয়েই মূলত প্রশ্ন করা হচ্ছে তাঁকে।

- Advertisement -

লালবাজার সূত্রের খবর, মধুছন্দাকে ইতিমধ্যেই দু’দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এবার স্বামী-স্ত্রীকে একসঙ্গে বসিয়ে বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন এবং পাস বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান তদন্তকারীরা। পুলিশের দাবি, দু’জনের বক্তব্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। মধুছন্দা অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদে পুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রির বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বলে খবর। তদন্তকারীদের ধারণা, সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে আর্থিক কাজকর্ম সম্পর্কে তাঁর কাছে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

এদিকে, তদন্তের আওতায় এবার ইন্দ্রনীল-কন্যা আভেরি সেনও। মঙ্গলবার তাঁকে লালবাজারে হাজিরার নোটিস পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি হাজিরা দিতে পারেননি বলে পুলিশ সূত্রে খবর। বুধবার দুপুরে তাঁকে ফের তলব করা হয়েছে। দ্বিতীয়বারের নোটিসের পরও হাজিরা এড়ালে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেনের সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা তাঁর কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন।

অন্যদিকে, মামলাকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে কলকাতা পুলিশ। ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট’ (West Bengal Maintenance of Public Order Act) বা এমপিও-র ২ ও ৯ নম্বর ধারা যুক্ত করার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে চলেছে লালবাজার। পুলিশ সূত্রের দাবি, প্রাক্তন মন্ত্রীর কাছে বিপুল পরিমাণ হিসাব-বহির্ভূত অর্থ ও সম্পত্তির উৎস জানতে চাওয়া হলেও সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। গান গেয়ে ওই অর্থ উপার্জনের দাবি করা হলেও তার পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি মেলেনি বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য।

মঙ্গলবার পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই এই ধারাগুলি যুক্ত করার অনুমতি চেয়ে কলকাতার সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করা হতে পারে। আদালত অনুমতি দিলে এই আইনের প্রয়োগের বিষয়টি নতুন পর্যায়ে পৌঁছবে। পুলিশের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় বেআইনি অর্থে কেনা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন আইনের ধারাও এই মামলায় যুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এখনও আদালতের অনুমোদন মেলেনি।

- Advertisement -

শুধু দুর্গাপুজোর পাস বিক্রিই নয়, পর্যটন দফতরের টেন্ডার সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তদন্তে যুক্ত হয়েছে। লালবাজারের দাবি, ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত তিনটি সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই সংস্থাগুলির সঙ্গে সরকারি কাজের বরাত এবং আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক কী ছিল, তা জানতে পর্যটন দফতরের কাছে প্রয়োজনীয় নথি চেয়েছে পুলিশ। এর আগে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বিভিন্ন কাজের টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ সামনে এসেছে।

তদন্তের পরিধি বাড়ার কারণেই বিশেষ তদন্তকারী দলের সদস্যসংখ্যা পাঁচ থেকে বাড়িয়ে ন’জন করা হয়েছে। জালিয়াতি দমন শাখা এবং ব্যাঙ্ক জালিয়াতি দমন শাখার আধিকারিকদেরও এই দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ইন্দ্রনীলের স্ত্রী-সহ অন্তত ন’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন গোয়েন্দারা। তাঁদের মধ্যে ‘মাস আর্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত তিন কর্মীও রয়েছেন। বিভিন্ন সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, লেনদেনের নথি এবং সরকারি দফতরের বরাত সংক্রান্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, পুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রির ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর (UNESCO) নাম ও লোগো ব্যবহারের অনুমোদন ছিল কি না, সেই বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পেতে চাইছে পুলিশ। এই সংক্রান্ত ব্যাখ্যা চেয়ে ইউনেস্কোর দিল্লির অফিসে ফের চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে বুধবার পর্যন্ত সেই চিঠির কোনও জবাব পাওয়া যায়নি বলে লালবাজার সূত্রে খবর।

সব মিলিয়ে পুজোর পাস বিক্রির অভিযোগ থেকে সরকারি টেন্ডার, একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং পরিবারের সদস্যদের আর্থিক লেনদেন—বিভিন্ন দিক ধরে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কলকাতা পুলিশ। তবে এই মামলার অভিযোগগুলি এখনও তদন্তাধীন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া বাকি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর