দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি ও ইউনেস্কোর (UNESCO) নাম-লোগো ব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের পরিবারের আর্থিক লেনদেনের উপর নজর বাড়াচ্ছে কলকাতা পুলিশ। এবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লালবাজারে তলব করা হল ইন্দ্রনীল সেনের মেয়েকে। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর নামে থাকা দু’টি সংস্থার সঙ্গে এই মামলার আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর আগে ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মধুছন্দা সেনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিল পুলিশ। ফলে পুজোর পাস সংক্রান্ত মামলায় সেন পরিবারের একাধিক সদস্যকে ঘিরে তদন্তের পরিধি বাড়ছে।
২ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল-কন্যার নামে থাকা ‘আইএসকেপ’ এবং ‘মায়েরা’ নামে দু’টি সংস্থার লেনদেন তদন্তকারীদের নজরে এসেছে। অভিযোগ, ‘মাস আর্ট’ (Mass Art) সংস্থার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সঙ্গে ওই সংস্থাগুলির আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে। সেই লেনদেনের প্রকৃতি, টাকার উৎস এবং কোথায় সেই অর্থ গিয়েছে, তা জানতে তাঁর বক্তব্য শুনতে চান গোয়েন্দারা। তবে তলব হওয়া মানেই কোনও অপরাধে তাঁর জড়িত থাকা প্রমাণিত নয়। তদন্তের স্বার্থেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছে পুলিশ।
গত ২৮ অক্টোবর প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেপ্তার করে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ সেল। ওই দিন সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন তিনি। দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রির নামে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)।
ইডির দফতর থেকে বেরোনোর পরই কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দারা তাঁকে আটক করেন। পরে লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। পুলিশের অভিযোগ, এর আগে একাধিকবার তলব করা হলেও তিনি হাজিরা দেননি। আগাম জামিনের আবেদনও আদালতে খারিজ হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই মামলায় কলকাতা পুলিশ ও ইডি পৃথকভাবে তদন্ত করছে। ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির পর আদালত তাঁকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়।
এই মামলার সূত্রপাত ব্যবসায়ী জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের দায়ের করা অভিযোগ থেকে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালে ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থা তৈরি হয়। দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশের পাস বিক্রির সঙ্গে সংস্থাটির নাম জড়ায়। অভিযোগকারীর দাবি, কলকাতার একাধিক বড় পুজো মণ্ডপের প্রিভিউ শোয়ের জন্য উচ্চমূল্যে টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সংস্থাটি নিজেদের ইউনেস্কোর সঙ্গে যুক্ত বা অনুমোদিত অংশীদার হিসেবে প্রচার করেছিল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাটির নাম ও লোগো ব্যবহার করে পাস বিক্রি করা হয়েছিল। এই ব্যবহারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে বউবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর তদন্ত শুরু করে কলকাতা পুলিশ। পরে গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ দল তদন্তের দায়িত্ব নেয়। ইডিও আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে পৃথক তদন্ত শুরু করে।
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির পর তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনকেও লালবাজারে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ৩১ অক্টোবর তিনি সেখানে গিয়ে তদন্তকারীদের মুখোমুখি হন। ‘মাস আর্ট’-এর সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র এবং সংস্থার আর্থিক লেনদেন নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এবার মেয়ের নামে থাকা দু’টি সংস্থার লেনদেন খতিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা। ‘মাস আর্ট’-এর মাধ্যমে পুজোর পাস বিক্রি করে সংগৃহীত অর্থ কোন কোন অ্যাকাউন্টে গিয়েছে, একাধিক সংস্থার মধ্যে টাকা কীভাবে ঘুরেছে এবং সেই লেনদেনের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কোনও যোগ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারীরা ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী-সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খতিয়ে দেখছেন। আদালতে পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থ লেনদেনের কথা জানানো হয়েছিল। তবে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলাদা আলাদা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট অঙ্ককে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্তকারীদের অভিযোগের পাশাপাশি ইন্দ্রনীল সেনের আইনজীবীর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে তাঁর আইনজীবী দাবি করেছিলেন, ইন্দ্রনীল সেন ‘মাস আর্ট’-এর কোনও পদে ছিলেন না এবং তদন্তে তাঁর ভূমিকা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে মামলার অভিযোগ ও তার জবাব—দু’দিকই বিচারাধীন তদন্তের অংশ।
এখন ইন্দ্রনীল-কন্যাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্তে নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকেই নজর। বিশেষ করে ‘মাস আর্ট’, পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সংস্থা এবং বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মধ্যে অর্থের লেনদেনের প্রকৃতি স্পষ্ট করাই তদন্তকারীদের অন্যতম লক্ষ্য। তবে অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।



