থানায় থানায় কালীপুজো করার প্রস্তাব ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হতেই এবার নিজের বক্তব্যের পক্ষে সওয়াল করলেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (Jagannath Chattopadhyay)। বিরোধীদের সমালোচনার মুখে তাঁর সাফ কথা, “যা বলেছি, বেশ করেছি।” তাঁর দাবি, থানায় কালীপুজো করা কোনও ধর্মীয় বিভাজনের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুলিশ সংস্কৃতির অংশ। একইসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলের প্রসঙ্গ তুলে তাঁদেরও নিশানা করেছেন তিনি। মন্ত্রীর বক্তব্য, অতীতে থানায় কালীপুজো নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে হবে পুলিশকে।
সিউড়িতে বীরভূম জেলা পুলিশের বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে প্রথম থানায় থানায় সাড়ম্বরে কালীপুজোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন জগন্নাথ। জেলা পুলিশ সুপারের কাছে তাঁর আবেদন ছিল, প্রত্যেক থানায় কালীপুজোর আয়োজন করা হোক। প্রয়োজনে থানায় কালীমূর্তিও রাখা হোক। সেই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় বিতর্ক। এবার নিজের অবস্থানে অনড় থেকে সেই প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দিলেন মন্ত্রী।
‘পুলিশ সংস্কৃতির অঙ্গ থানায় কালীপুজো’
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, থানায় কালীপুজো করার প্রস্তাব তিনি যথেষ্ট কারণেই দিয়েছেন। তাঁর দাবি, আজন্মকাল ধরে বিভিন্ন থানায় কালীপুজোর প্রচলন রয়েছে। তাই এটিকে নতুন কোনও ধর্মীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
মন্ত্রীর কথায়, “যা বলেছি বেশ করেছি। সঙ্গত কারণ আছে বলেই বলা হয়েছে। আজন্মকাল থানায় থানায় কালীপুজো হয়ে আসছে। পুলিশ সংস্কৃতির অঙ্গ থানায় কালীপুজো করা।”
এর আগে সিউড়ির অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, বাঙালির স্কুলে স্কুলে যেমন সরস্বতী পুজোর সংস্কৃতি রয়েছে, তেমনই থানায় কালীপুজোও পুলিশ সংস্কৃতির অংশ হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, পুলিশকর্মীরা শক্তির উপাসক। অভিযানে বেরোনোর আগে দেবীর কাছে প্রার্থনা করলে বাহিনীর মনোবল বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি।
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে রঘু ডাকাতের প্রসঙ্গও টেনেছিলেন মন্ত্রী। লোককথা অনুযায়ী, ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে রঘু ডাকাত মা কালীর পুজো করতেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। থানায় কালীমূর্তি থাকলে অপরাধী ও পুলিশ—উভয়েই দেবীর সামনে প্রার্থনা করতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেছিলেন জগন্নাথ।
জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ও মমতাকে একযোগে আক্রমণ
থানায় কালীপুজো নিয়ে বিতর্কের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এবার রাজ্যের তিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আমলের প্রসঙ্গ তুলেছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়ে থানায় কালীপুজো নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখানো হয়নি। পরবর্তী সময়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পৃথক সংখ্যালঘু দফতর তৈরি করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগও তুলেছেন জগন্নাথ। তাঁর দাবি, ভোটের স্বার্থে তৎকালীন সরকার থানায় কালীপুজোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞামূলক অবস্থান নিয়েছিল। তবে এগুলি মন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট সরকারের সিদ্ধান্ত বা নির্দেশের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে এগুলিকে দেখা উচিত নয়।
জগন্নাথের বক্তব্য, গত কালীপুজোয় মা কালীর মূর্তিকে পুলিশ প্রিজন ভ্যানে তোলার যে ছবি সামনে এসেছিল, তা গোটা রাজ্যের মানুষ দেখেছেন। সেই ঘটনার উল্লেখ করেই তিনি বলেন, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে পুলিশকে এবার থানায় থানায় কালীপুজোর মাধ্যমে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে হবে।
মন্ত্রীর প্রস্তাবকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নও উঠেছে। থানার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের পুজোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলে পুলিশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেছেন, মন্ত্রীর পদে থেকে থানায় কালীপুজোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কথা বলা সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে এই আপত্তির পাশাপাশি পুলিশের নিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রশ্নও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, মন্ত্রীর বক্তব্যের সমর্থকেরা বিষয়টিকে বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতি ও বহু থানায় আগে থেকে প্রচলিত পুজোর ধারার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন শুধু কালীপুজোর আয়োজন নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ভূমিকা এবং পুলিশের নিরপেক্ষতা—দু’টি বিষয়ই।
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের প্রস্তাবের পর বীরভূম-সহ একাধিক জেলার থানায় কালীপুজোর প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে মন্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে সব থানায় সরকারি নির্দেশ জারি হয়েছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন, থানায় কালীপুজোকে কি শুধুই স্থানীয় উদ্যোগ হিসেবে রাখা হবে, নাকি সরকারি নির্দেশিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমে তা চালু করা হবে? সেই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পুলিশকর্মীদের দায়িত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পুলিশের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিতর্কের মুখে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় নিজের বক্তব্য থেকে সরছেন না। বরং বাম ও তৃণমূল সরকারের অতীত ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে নিজের প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এবার রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসন এই প্রস্তাব নিয়ে কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



