প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের (Buddhadeb Bhattacharjee) সন্তান। সেই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রত্যাশা, চাপ এবং রাজনৈতিক পরিসরে নানা অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা না বললেও এবার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুললেন সুচেতন ভট্টাচার্য (Suchetan Bhattacharya)। এসএফআইয়ের (SFI) সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সিপিএমের (CPI-M) কিছু নেতার কথিত দ্বিচারিতা—একাধিক বিষয়ে সরব হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বাবার অধরা শিল্পায়নের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের উপরও আশা প্রকাশ করেছেন বুদ্ধদেবপুত্র।
১ নভেম্বর প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে সুচেতন জানিয়েছেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সন্তান হওয়ার কারণে তাঁকে যেমন বাইরের নানা চাপ সামলাতে হয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক সংগঠনের অন্দরেও নিজের মতো করে চলার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আগ্রহ থাকলেও সংগঠনের কিছু নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতার ভাবনার সঙ্গে মেলেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ধীরে ধীরে এসএফআই এবং দলের সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান তিনি।
এসএফআই ছাড়ার কারণ জানালেন সুচেতন
ছাত্রজীবনে প্রেসিডেন্সি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পড়ুয়া ছিলেন সুচেতন। পারিবারিক রাজনৈতিক আবহের কারণে বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সংগঠনের কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
সুচেতনের বক্তব্য, এসএফআইয়ের একটি সময়ে সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দ, কে কোন বই পড়বেন, কার সঙ্গে মিশবেন বা কথা বলবেন—এমন বিষয়েও সংগঠনের তরফে নির্দেশ দেওয়ার প্রবণতা ছিল। এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ তিনি মেনে নিতে পারেননি।
নিজের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীন চিন্তার উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে সুচেতন বলেন, সবাইকে একই কথা বলতে হবে বা একই মত অনুসরণ করতে হবে—এমন সাংগঠনিক সংস্কৃতি তাঁর পছন্দ ছিল না। ক্রমশ বিরক্তি বাড়ায় শেষ পর্যন্ত এসএফআই ছেড়ে বেরিয়ে আসেন তিনি।
এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাবা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁকে কোনও বাধা দেননি বলেও জানিয়েছেন সুচেতন। বরং নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন বাবা। রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নেও পরিবারের মধ্যে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হত বলে তাঁর বক্তব্য।
সিপিএমের কিছু নেতার দ্বিচারিতা নিয়েও সরব
শুধু ছাত্র সংগঠন নয়, সিপিএমের কিছু নেতার রাজনৈতিক জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সুচেতন। তাঁর অভিযোগ, একাংশের বামপন্থী নেতা প্রকাশ্যে নিজেদের সর্বহারা হিসেবে তুলে ধরেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁদের জীবনযাপনের সঙ্গে সেই বক্তব্যের মিল পাওয়া যায় না।
সুচেতনের কথায়, কেউ কেউ প্রকাশ্যে আর্থিক অনটনের কথা বললেও তাঁদের সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনা বা নিজেদের সম্পত্তির মতো বিষয় সামনে এলে অন্য ছবি দেখা যায়। এই ধরনের দ্বিচারিতা তাঁর অপছন্দের।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে হওয়ার কারণে দলের ভিতরেও তাঁকে নানা চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। দলের গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক নিয়মের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল। তাই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তবে নিজের বক্তব্যে জানিয়েছেন, এখনও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সিপিএমকেই বেছে নেন তিনি।
সিঙ্গুরে শিল্প না হওয়ার আক্ষেপ ছিল বুদ্ধদেবের
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আবেগঘন অংশ ছিল বাবার শিল্পায়নের স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প গড়ে তোলার জন্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উদ্যোগ এবং সিঙ্গুরে টাটার প্রস্তাবিত গাড়ি কারখানা না হওয়ার প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সুচেতন।
তাঁর বক্তব্য, সিঙ্গুরে শিল্প না হওয়ার আক্ষেপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনের শেষ পর্বেও ছিল। রাজ্যে শিল্পায়নের যে পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় হতাশা থেকেই গিয়েছিল। সুচেতনের কথায়, বাবার কাছে এই বিষয়টি ছিল শুধু একটি কারখানা তৈরির প্রশ্ন নয়; বাংলার যুবসমাজের কর্মসংস্থান এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও তা জড়িত ছিল।
সিঙ্গুরের পাশাপাশি রাজ্যে বৃহত্তর শিল্প পরিকাঠামো গড়ে তোলার যে স্বপ্ন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দেখেছিলেন, তা পূরণ হলে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারত বলে মনে করেন সুচেতন।
শিল্পায়ন নিয়ে শুভেন্দু সরকারের উপর আশা সুচেতনের
বর্তমান রাজ্য সরকারের শিল্পনীতি নিয়েও নিজের মত জানিয়েছেন বুদ্ধদেবপুত্র। তাঁর বক্তব্য, নতুন সরকার শিল্পস্থাপনের ক্ষেত্রে সদর্থক পদক্ষেপ করছে বলে তিনি মনে করছেন। সেই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পেলে তাঁর বাবা খুশি হতেন বলেই বিশ্বাস সুচেতনের।
এর আগে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্যও রাজ্যে শিল্পায়নের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের প্রতি আশা প্রকাশ করেছিলেন। সিঙ্গুরে শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যে শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
সুচেতনের বক্তব্যেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। তবে তাঁর এই মন্তব্যকে বর্তমান সরকারের শিল্পনীতি সম্পর্কে ব্যক্তিগত আশাবাদ হিসেবেই দেখা উচিত। ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা শিল্প, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে পরিণত হয়, তা নির্ভর করবে প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নের উপর।
একদিকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বাধীন চিন্তার কথা বলছেন সুচেতন, অন্যদিকে বাবার অসমাপ্ত শিল্পায়নের স্বপ্ন নিয়েও প্রকাশ্যে মত জানাচ্ছেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে, তখন তাঁর ছেলের এই সাক্ষাৎকারও সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করল।



