বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে ‘মুরাসু’। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের (India Meteorological Department বা IMD) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার, ২ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে মঙ্গলবার ভোরের মধ্যে দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে এই ঘূর্ণিঝড়। ল্যান্ডফলের সময় ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার হতে পারে। দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ পৌঁছতে পারে ১২০ কিলোমিটারে। তবে বাংলার ক্ষেত্রে আপাতত সরাসরি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের আশঙ্কা নেই। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অন্ধ্র উপকূলে মুরাসুর তাণ্ডবের কতটা প্রভাব পড়বে বাংলার আবহাওয়ায়?
শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত মুরাসু, কোথায় হবে ল্যান্ডফল?
আবহাওয়া দফতরের ২ নভেম্বরের বুলেটিন অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম ও সংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের উপর অবস্থান করছে ঘূর্ণিঝড়টি। সোমবার রাত ২টো ৩০ মিনিটের পর্যবেক্ষণে ঝড়টির অবস্থান ছিল ১৩.৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮২.৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের কাছে। গত ছয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রায় ২০ কিলোমিটার গতিতে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়েছে মুরাসু।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, নেল্লোর ও নারসাপুরের মধ্যবর্তী উপকূলবর্তী এলাকায়, ওঙ্গোলের কাছাকাছি ল্যান্ডফল হতে পারে। সম্ভাব্য সময় ২ নভেম্বর রাত ১১টা ৩০ মিনিট থেকে ৩ নভেম্বর ভোর ৪টের মধ্যে। উপকূল অতিক্রম করার সময় ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০-১১০ কিলোমিটার থাকতে পারে। ঝোড়ো হাওয়ার সর্বোচ্চ বেগ হতে পারে ১২০ কিলোমিটার।
অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে তাই বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। উপকূলের নিচু এলাকাগুলিতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষকে আবহাওয়া দফতর ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মুরাসুর প্রভাবে বাংলায় কি লণ্ডভণ্ড হবে?
ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে থাকায় পশ্চিমবঙ্গে সরাসরি আছড়ে পড়ার আশঙ্কা নেই। তবে তার প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় আকাশ মেঘলা থাকবে। সোমবার ও মঙ্গলবার বিক্ষিপ্তভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি কিংবা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুরে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলাতেও কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টি হতে পারে। তবে এই বৃষ্টিকে ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি প্রভাবজনিত বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছে না আবহাওয়া দফতর।
উত্তরবঙ্গের কোন কোন জেলায় বৃষ্টি?
মুরাসুর পরোক্ষ প্রভাবে উত্তরবঙ্গের আবহাওয়াতেও কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের এক-দু’টি জায়গায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিও হতে পারে।
তবে উত্তরবঙ্গের জন্য আপাতত ভারী বৃষ্টির কোনও বড় সতর্কতার কথা জানানো হয়নি। মালদহ, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুরেও আবহাওয়ার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা হচ্ছে। বুধবার থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে পূর্বাভাস।
কবে থেকে পরিষ্কার হবে আকাশ?
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলাতেও হালকা বৃষ্টি হতে পারে। তবে ৪ নভেম্বর থেকে দুই বঙ্গেই আবহাওয়ার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শনিবার পর্যন্ত অধিকাংশ জেলায় শুষ্ক আবহাওয়া বজায় থাকতে পারে।
মৎস্যজীবীদের জন্য কী সতর্কতা?
ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর কারণে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজর রাখছে আবহাওয়া দফতর। পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর, সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ ওড়িশা উপকূলের দিকে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। সমুদ্র উত্তাল থাকার সম্ভাবনা থাকায় সতর্কতা জারি রয়েছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি আছড়ে পড়ার কোনও পূর্বাভাস নেই। হুগলি নদীর কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরে দূরবর্তী সতর্কতা সংকেত ২ জারি থাকার খবরও পাওয়া গিয়েছে। তাই সমুদ্রে যাওয়ার আগে মৎস্যজীবীদের সংশ্লিষ্ট বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ নির্দেশিকা মেনে চলা জরুরি।
সব মিলিয়ে, ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর মূল বিপদের মুখে দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল। বাংলায় আপাতত বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা নেই। তবে আগামী দু’দিন কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি বদলালে নতুন সতর্কতা জারি হতে পারে। তাই সাধারণ মানুষকে সরকারি আবহাওয়া বুলেটিনের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।



