কলকাতা পুরসভার আসন্ন নির্বাচনের আগে প্রার্থী বাছাই ঘিরে তৎপরতা তুঙ্গে। ২০৯টি ওয়ার্ডে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিজেপি। দলীয় সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই প্রার্থী হওয়ার আবেদন জানিয়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি বায়োডাটা জমা পড়েছে। চিকিৎসক, আইনজীবী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়তে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। পাশাপাশি তৃণমূলের একাধিক প্রাক্তন কাউন্সিলর ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদেরও বিজেপির প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, গত পুরবোর্ডের বহু কাউন্সিলর এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের হয়ে লড়বেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কলকাতা পুরসভার (Kolkata Municipal Corporation) আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিজেপি। দলের পুরনো রাজ্য দফতর ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেনে আবেদন জমা নেওয়ার জন্য ড্রপবক্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবেদনকারীদের বায়োডাটা খতিয়ে দেখছেন দলের নেতৃত্ব। শুধু পরিচিত রাজনৈতিক মুখ নয়, পেশাগত পরিচিতি, এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিজেপির তরফে জানানো হয়েছে, কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডেই প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
বিজেপির এই আবেদন প্রক্রিয়ায় চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সমাজকর্মী-সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার আগেই জানিয়েছিলেন, শুধু দলের পুরনো কর্মী হলেই টিকিট পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। প্রার্থীর ভাবমূর্তি, স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং জয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আবেদন জমা পড়ার সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে কয়েক হাজার আবেদনের কথা জানিয়েছিল বিজেপি নেতৃত্ব।
তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরদের বিজেপিতে যোগ দেওয়া এবং পদ্ম প্রতীকে লড়ার সম্ভাবনাও এবারের পুরভোটের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, কয়েকজন প্রাক্তন কাউন্সিলর নিজেদের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠদেরও প্রার্থী করার জন্য বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অন্যদিকে, কয়েকজন প্রাক্তন কাউন্সিলরকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করার খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব প্রকাশ্যে জানিয়েছে, প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলরদের টিকিট দেওয়া নিয়ে যে জল্পনা চলছে, সে বিষয়ে দলের কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রাক্তন কাউন্সিলরদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারও বক্তব্য, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য আর্থিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। আবার কারও ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পরিবারের আপত্তি এবং আইনি মামলার বিষয়ও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। তবে তৃণমূলের তরফে সব প্রাক্তন কাউন্সিলর নির্বাচনে অনাগ্রহী, এমন কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি।
‘মমতা তৃণমূল’-এর রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ও প্রাক্তন কাউন্সিলরদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার প্রবণতায় কেউ কেউ বিজেপির টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার কয়েকজন বিজেপির হামলা ও পুলিশি হেনস্তার আশঙ্কায় ভোটের ময়দান থেকে দূরে থাকতে চাইছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এই অভিযোগের বিষয়ে বিজেপির পাল্টা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, কলকাতার পুরভোটে তৃণমূলের পুরনো নেতৃত্বের একাধিক পরিচিত মুখের অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় আপাতত সক্রিয় রাজনীতিতে নেই। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি বা তাঁর মেয়ে এবার পুরভোটে প্রার্থী হচ্ছেন না। ২২ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের প্রার্থী হওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রাক্তন মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার এবং সন্দীপ রঞ্জন বক্সীও এবারের নির্বাচনে না লড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। সন্দীপ বক্সীর ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে লড়তে চান না বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, স্বপন সমাদ্দারের বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির আইনি জটিলতা পুরোপুরি না মেটা পর্যন্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা নেই।
তবে তৃণমূলের সব প্রাক্তন কাউন্সিলর যে ভোট থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন, তা নয়। রত্না শূর ও রূপক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কয়েকজন পুরনো মুখের নির্বাচনে লড়ার আগ্রহ রয়েছে। বেহালার প্রাক্তন চিফ ইলেকশন এজেন্ট অঞ্জন দাসও জানিয়েছেন, হামলার আশঙ্কা থাকলেও তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রার্থী হিসেবে লড়তে চান। বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী চৈতালী চট্টোপাধ্যায় অবশ্য দু’জনেই এবার প্রার্থী হতে চান না বলে জানিয়েছেন। তবে দলীয় নেতৃত্ব নির্দেশ দিলে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বৈশ্বানর।
এদিকে, কলকাতার রাজনৈতিক সমীকরণে আরও একটি শক্তি হিসেবে উঠে আসছে ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস। ওই দলের রাজ্য যুব সভাপতি সৌরভ বসু আগে ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। এবার ওয়ার্ডটি মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় হাজরা-রাসবিহারী এলাকায় অন্য আসন থেকে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। দলের পরিষদীয় নেতৃত্বের তরফে সন্দীপন সাহা জানিয়েছেন, কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডেই প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় মমতা-তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরদের একাংশ ডেমোক্রেটিক তৃণমূলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়নি। ফলে কোন ওয়ার্ডে কোন দল কাকে প্রার্থী করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, বিজেপি কলকাতার পুরভোটে ১৮০টির বেশি ওয়ার্ডে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি চালাচ্ছে বলে দলীয় মহলে দাবি করা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের ফল নিয়ে আগাম কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কলকাতার ১৪৪টি পুরনো ওয়ার্ডের মধ্যে ১০২টিতে বিজেপি এগিয়ে ছিল। সেই ফলকে সামনে রেখেই পুরভোটের প্রস্তুতি সাজাচ্ছে গেরুয়া শিবির।
কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে ২০৯ হওয়ায় এবার প্রার্থী বাছাই ও আসন সমঝোতার সমীকরণও বদলেছে। বিজেপি ইতিমধ্যেই সব ওয়ার্ডে এককভাবে লড়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল, বাম ও কংগ্রেসও নিজেদের প্রার্থী বাছাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে আসন্ন পুরভোটে শুধু দলীয় শক্তি নয়, স্থানীয় পরিচিতি, পুর পরিষেবার অভিজ্ঞতা এবং প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



