গভীর সমুদ্রে সোমালিয়ার সশস্ত্র জলদস্যুদের বিরুদ্ধে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অভিযান চালিয়ে বড় সাফল্য পেল ভারতীয় নৌসেনা (Indian Navy)। আরব সাগরে মুম্বই থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অপহৃত মাছ ধরার জাহাজ ‘আজিনি’ (Azini) উদ্ধার করলেন নৌসেনার জওয়ানরা। জাহাজে থাকা ২০ জন ক্রু সদস্যকেও নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। এই অভিযানে ভারতীয় নৌসেনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা (Indian Air Force)। আকাশপথ থেকে প্যারাশুটের সাহায্যে নামানো হয় বিশেষ কমান্ডো বাহিনী মার্কোসকে (MARCOS)। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, গোটা অভিযানে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কেন জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল ‘আজিনি’?
জানা গিয়েছে, সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে সশস্ত্র জলদস্যুরা মাছ ধরার জাহাজ আজিনি দখল করে নেয়। ঘটনাটি ঘটে ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে। এরপর থেকেই জাহাজটির গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করে ভারতীয় নৌসেনা।
নৌসেনার আশঙ্কা ছিল, জলদস্যুরা এই মাছ ধরার জাহাজটিকে ‘মাদার শিপ’ বা ভাসমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজগুলির উপর আরও হামলার আশঙ্কা তৈরি হত।
শুধু ২০ জন ক্রুর জীবন বাঁচানোই নয়, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার স্বার্থেও জাহাজটি উদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত অভিযানের প্রস্তুতি নেয় ভারতীয় নৌসেনা।
অভিযানে একাধিক আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করতে মোতায়েন করা হয় যুদ্ধজাহাজ আইএনএস কলকাতা (INS Kolkata), সামুদ্রিক নজরদারি বিমান P-8I এবং সি গার্ডিয়ান (Sea Guardian) ড্রোন।
প্রথমে আকাশ ও সমুদ্রপথে লাগাতার নজরদারি চালিয়ে আজিনির অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। এরপর জাহাজটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে জলদস্যুদের পালানোর সম্ভাবনা আটকানোর কৌশল নেয় নৌসেনা। সরাসরি সংঘর্ষের পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে জাহাজটির চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনার পদক্ষেপও করা হয়।
মুম্বই থেকে ৩ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে এই অভিযান চালানো হয়েছিল। ফলে এত দূরের সমুদ্র এলাকায় জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করা এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা ছিল বিশেষ চ্যালেঞ্জের।
অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ময়দানে নামানো হয় ভারতীয় নৌসেনার বিশেষ কমান্ডো বাহিনী মার্কোসকে। ভারতীয় বায়ুসেনার C-17 গ্লোবমাস্টার (C-17 Globemaster) বিমান থেকে নির্দিষ্ট এলাকায় প্যারাশুটের সাহায্যে নামানো হয় তাঁদের।
এরপর পরিকল্পনামাফিক অভিযান চালিয়ে জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় কমান্ডো বাহিনী। সশস্ত্র জলদস্যুদের প্রতিহত করে নিরাপদ করা হয় গোটা জাহাজ। উদ্ধার করা হয় ভিতরে আটকে থাকা ২০ জন ক্রু সদস্যকে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ২ নভেম্বর অভিযান সম্পূর্ণ হয়। উদ্ধার হওয়া প্রত্যেক ক্রু সদস্য নিরাপদে রয়েছেন। এই অভিযানে কোনও প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর নেই।
এই সফল অভিযানের জন্য ভারতীয় নৌসেনা ও বায়ুসেনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh)। তাঁর বক্তব্য, এত দূরে গিয়ে সশস্ত্র জলদস্যুদের কবল থেকে জাহাজ ও ক্রু সদস্যদের নিরাপদে উদ্ধার করা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি এবং দক্ষ সমন্বয়ের পরিচয়।
তিনি আরও জানান, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যকে সুরক্ষিত রাখতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভারতীয় নৌসেনার মতে, এই অভিযান প্রমাণ করেছে যে দেশের সামরিক বাহিনী সমুদ্রের গভীরেও জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। নৌসেনা, বায়ুসেনা এবং বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে এই উদ্ধার অভিযান।



