পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরে বড়সড় নিয়োগের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বুধবার দফতরের পর্যালোচনা বৈঠকের পর তিনি জানান, মোট ৭১৯০ জনকে স্থায়ী পদে নিয়োগ করা হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (PSC)। লক্ষ্য, ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে নিয়োগ সম্পূর্ণ করা। পাশাপাশি কাজের গতি বাড়াতে এক বছরের জন্য ১০০০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মীও নেওয়া হবে। শুধু নিয়োগ নয়, নিউটাউনে পাঁচ একর জমির উপর নতুন পঞ্চায়েত ভবন তৈরির ঘোষণাও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বুধবার পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের সদর দফতরে এই পর্যালোচনা বৈঠক হয়। উপস্থিত ছিলেন দফতরের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, অন্যান্য মন্ত্রী, রাজ্যের জেলাশাসক (DM) এবং ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকরা (BDO)। বৈঠকে মূলত ১২৫ দিনের গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প, পঞ্চায়েতের কাজের অগ্রগতি এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়।
৭১৯০ স্থায়ী পদে নিয়োগ, দায়িত্বে PSC
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরে কর্মীর অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পর্যাপ্ত কর্মী প্রয়োজন। সেই ঘাটতি মেটাতেই ৭১৯০ জনকে স্থায়ী পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, নিয়োগের নিয়মে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সেই কারণে দীপাবলির পর বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে নিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়টি আনা হতে পারে।
সরকারের লক্ষ্যমাত্রা, ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে নতুন কর্মীদের নিয়োগ সম্পূর্ণ করা। পাশাপাশি এক বছরের জন্য ১০০০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নেওয়া হবে। স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় যাতে পঞ্চায়েতের কাজ থমকে না থাকে, সেই কারণেই আপাতত চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত।
নিউটাউনে তৈরি হবে নতুন পঞ্চায়েত ভবন
পঞ্চায়েত দফতরের পরিকাঠামো উন্নয়নেও বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিউটাউনে পাঁচ একর জমির উপর তৈরি হবে নতুন পঞ্চায়েত ভবন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, যেখানে নতুন প্রশাসনিক ভবন এবং বিধানসভা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, তার পাশেই এই জমি দেওয়া হবে।
নতুন ভবন তৈরি হলে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ আরও সুসংগঠিতভাবে করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে রাজ্য সরকার। গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নমূলক প্রকল্প পরিচালনা এবং জেলা ও ব্লক স্তরের প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও এই ভবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বৈঠকে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের জব কার্ড নিয়েও বড় দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আধার সংযুক্তিকরণ ও KYC যাচাইয়ের সময় প্রায় ৩১ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ডের নাম বাদ গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ওই কার্ডগুলির মাধ্যমে আগে অর্থও তোলা হয়েছিল।
পাশাপাশি নতুন করে প্রায় ১০ লক্ষ জব কার্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, নতুন ব্যবস্থায় প্রকৃত উপভোক্তাদের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে ৩১ লক্ষ জব কার্ড বাতিলের বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান ও দাবি হিসেবেই বিবেচ্য।
রাজ্যে ১২৫ দিনের গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, প্রকল্পের আওতায় মোট ২২ কোটি কর্মদিবস তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এর জন্য প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই খরচের বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকার বহন করবে। কেন্দ্রের বরাদ্দ প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা এবং রাজ্য সরকারের অংশ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের তরফে প্রথম ধাপে ১২০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ৬৫ লক্ষ ৬২ হাজার কর্মদিবস তৈরি হয়েছে বলে দাবি মুখ্যমন্ত্রীর। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ লক্ষ ৯ হাজার কর্মদিবস তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ২২ লক্ষ মানুষ এই প্রকল্পে কাজ করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৈঠকে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার আগের পরিস্থিতি নিয়েও সরব হন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় একাধিক অনিয়ম হয়েছে এবং নির্বাচনে ভোট লুটের কারণে বহু জায়গায় প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্ব বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, গ্রামীণ কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে আবাসন, রাস্তা এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে পঞ্চায়েতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশাসনিক স্তরে কর্মীর অভাব দূর করা এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাই সরকারের লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে পঞ্চায়েত দফতরে ৭১৯০ স্থায়ী নিয়োগ, ১০০০ চুক্তিভিত্তিক কর্মী নেওয়া এবং নিউটাউনে নতুন ভবন তৈরির ঘোষণা রাজ্যের গ্রামীণ প্রশাসনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, শূন্যপদের বিস্তারিত তালিকা এবং আবেদন পদ্ধতি প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চাকরিপ্রার্থীদের অপেক্ষা করতে হবে।



