সরকারি প্রকল্পের টাকা পেতে পরিচয় যাচাইয়ের নিয়মে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রী রাজীবরঞ্জন সিং ওরফে লালন সিং (Rajiv Ranjan Singh)। তাঁর ঘোষণা, উপভোক্তাদের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে আধার কার্ড আর পরিচয় যাচাইয়ের প্রধান ভিত্তি থাকবে না। তার পরিবর্তে ব্যবহার করা হবে বায়োমেট্রিক তথ্য এবং ভোটার পরিচয়পত্রের EPIC নম্বর। গত ৩০ অক্টোবর দিল্লিতে কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রকের আয়োজিত ‘ন্যাশনাল ওয়ার্কশপ অন পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেন ২০২৬-২৭’ অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন তিনি। পরে ৩ নভেম্বর গ্যাংটকেও একই ধরনের বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
তবে এই ঘোষণার পরেও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ঠিক কোন কোন সরকারি প্রকল্পে নতুন পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু হবে, কবে থেকে তা কার্যকর হবে এবং যাঁদের ভোটার কার্ড নেই বা ভোটার তালিকায় নাম নেই, তাঁদের কী হবে—এসব বিষয়ে এখনও কোনও বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়নি।
দিল্লির কর্মশালায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে লালন সিং বলেন, আধার কার্ড তৈরির কেন্দ্র এখন দেশের প্রায় সর্বত্র রয়েছে। তাঁর দাবি, মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আধার কার্ড তৈরি করানো সম্ভব। ফলে শুধু আধার কার্ডের উপর নির্ভর করে উপভোক্তার পরিচয় যাচাই করলে জালিয়াতির আশঙ্কা থেকে যায়।
এই কারণেই সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপভোক্তার বায়োমেট্রিক তথ্য এবং ভোটার কার্ডের EPIC নম্বরকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুই তথ্যের মাধ্যমে উপভোক্তার পরিচয় যাচাই করে অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
তবে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের জন্য ঠিক কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, আঙুলের ছাপ নাকি অন্য কোনও পদ্ধতি, তা এখনও বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি।
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রকের অধীনে এমন কোনও প্রকল্প নেই, যেখানে সরাসরি ব্যক্তিগত উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পাঠানো হয়। তবে লালন সিংয়ের হাতে থাকা মৎস্য, পশুপালন ও ডেয়ারি মন্ত্রকের অধীনে এমন কিছু প্রকল্প রয়েছে, যেখানে সুবিধা পেতে আধার সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হয়।
উদাহরণ হিসেবে ন্যাশনাল লাইভস্টক মিশনের (National Livestock Mission) এন্ট্রাপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের কথা বলা যায়। এই প্রকল্পে সুবিধা পেতে উপভোক্তাকে আধার নম্বরের প্রমাণ দিতে হয় অথবা আধার অথেনটিকেশন করাতে হয়।
এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি (PM-KISAN), প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণ (PMAY-G), গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প এবং জাতীয় সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির মতো একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে আধার-সংযুক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়।
কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্যের পর এই প্রকল্পগুলির নিয়মে কী পরিবর্তন আসবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে আধার-ভিত্তিক DBT বা সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফারের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, সেখানে নতুন ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে, তা জানার জন্য সরকারি বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করতে হবে।
লালন সিংয়ের এই মন্তব্য সামনে আসতেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, ভোটার কার্ডের EPIC নম্বরকে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হলে ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু SIR-এর পর তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ল। সেক্ষেত্রে তিনি কি প্রকল্পের টাকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন? আবার যাঁদের বয়স ১৮ বছরের কম, কিংবা যাঁরা অন্য কারণে ভোটার কার্ড পাননি, তাঁদের জন্য বিকল্প পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা কী হবে?
এই প্রশ্নগুলির কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও দেননি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ফলে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে কারা কীভাবে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত নির্দেশিকার প্রয়োজন রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্যকে এখনও সব সরকারি প্রকল্পে আধার বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। কারণ, বিভিন্ন প্রকল্পে আধার ব্যবহারের জন্য পৃথক আইন, সরকারি নির্দেশিকা এবং DBT-সংক্রান্ত নিয়ম রয়েছে।
কোনও মন্ত্রীর বক্তব্যের পরেই সেই নিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যায় না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক ও দফতরের বিজ্ঞপ্তি, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন এবং প্রকল্পভিত্তিক নির্দেশিকা প্রকাশের পরেই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
তাই আপাতত উপভোক্তাদের আধার কার্ড বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আধার সংযুক্তিকরণ বাতিল করার প্রয়োজন নেই। সরকারি বিজ্ঞপ্তি না আসা পর্যন্ত আগের নিয়ম মেনেই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তাদের পরিচয় যাচাইয়ে আধারের পরিবর্তে EPIC নম্বর ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহারের প্রস্তাব নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে এই পরিবর্তন কতটা বিস্তৃত হবে, কোন প্রকল্পে আগে চালু হবে এবং ভোটার তালিকায় নাম না থাকা উপভোক্তাদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে—সেই উত্তর মিলবে কেন্দ্রের বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশের পরেই।



