কলকাতা, হাওড়া ও সল্টলেকের ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় গড়ে তোলা হবে আধুনিক হকার জোন। শুধু তাই নয়, লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আদলে সাজানো হবে কলেজ স্ট্রিট, মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভের মতো আধুনিক রূপ পাবে গঙ্গার দুই পাড়। ট্যাংরার চায়না টাউন, মায়াপুর, চন্দননগর-সহ রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জনপদের চেহারা বদলানোর পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। এই লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা ন্যাশনাল বিল্ডিংস কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (NBCC)-এর সঙ্গে ন’টি মৌ চুক্তি করেছে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর। প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে কলকাতা-সহ একাধিক শহরের নগর পরিকাঠামো ও পর্যটন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সল্টলেকে সোমবার এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক শহরগুলির আদলে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কলকাতার ঐতিহ্য বজায় রেখেই আধুনিক নাগরিক পরিষেবা, পর্যটকদের সুবিধা এবং ব্যবসায়িক পরিকাঠামো উন্নত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, কলেজ স্ট্রিটকে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আদলে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গঙ্গার দুই তীরকে মুম্বইয়ের মেরিন ড্রাইভের মতো আধুনিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি ট্যাংরার চায়না টাউনেও চিনা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একইসঙ্গে কলকাতা, হাওড়া ও সল্টলেকে ব্যাংককের আদলে পরিকল্পিত হকার জোন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করে তৈরি হবে আধুনিক হকার জোন
শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং হকারদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবসার জায়গা তৈরি করা এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কলকাতা, হাওড়া ও সল্টলেকের নির্দিষ্ট এলাকায় গড়ে উঠবে পরিকল্পিত ভেন্ডিং জোন। সেখানে থাকবে ফুড স্ট্রিট, ফুড কোর্ট এবং আধুনিক ভেন্ডিং গাড়ি। বিশেষ এই গাড়িগুলিতে কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে একদিকে পথচারীদের চলাচল সহজ হবে, অন্যদিকে হকারদের ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট পরিকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন। তবে কোন কোন এলাকায় এই জোন তৈরি হবে, কতজন হকারকে জায়গা দেওয়া হবে এবং বর্তমান হকারদের পুনর্বাসন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনও সামনে আসেনি।
কলেজ স্ট্রিট থেকে ট্যাংরা, বদলাবে ঐতিহ্যবাহী এলাকার চেহারা
কলকাতার ঐতিহাসিক কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়াকে আধুনিক করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বইয়ের দোকান, প্রকাশনা সংস্থা এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা-সংস্কৃতির পরিবেশ বজায় রেখেই এলাকার পরিকাঠামো উন্নত করা হবে। পাশাপাশি ট্যাংরার চায়না টাউনে চিনা স্থাপত্য ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক মানের সৌন্দর্যায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কাজের জন্য আন্তর্জাতিক স্থপতিদের সাহায্য নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন পুরমন্ত্রী।
মেরিন ড্রাইভের আদলে সাজবে গঙ্গার দুই পাড়
গঙ্গার দুই তীরের সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কলকাতা ও হাওড়ার গঙ্গাপাড়ে চার লেনের রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি থাকবে পৃথক হাঁটার পথ এবং সাইকেল চালানোর জন্য নির্দিষ্ট ট্র্যাক। নাগরিকদের বসার জায়গা, পর্যটকদের সুবিধা এবং অন্যান্য আধুনিক পরিষেবার পরিকাঠামোও তৈরি করার কথা রয়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গঙ্গার দুই পাড়ে যাতায়াতের পাশাপাশি বিনোদন ও পর্যটনের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে রাস্তার নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য, প্রকল্পের খরচ এবং কাজ শুরুর সময়সীমা এখনও বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি।
মায়াপুর ও চন্দননগরেও পর্যটন পরিকাঠামোয় জোর
নবদ্বীপ ও মায়াপুরকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্যের। ইসকন মন্দিরের পাশাপাশি শ্রীচৈতন্যদেবের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান এবং ঐতিহাসিক ঘাটগুলির উন্নয়ন করা হবে। পর্যটকদের যাতায়াত ও থাকার সুবিধা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে।
অন্যদিকে, চন্দননগরের নদীতীরবর্তী এলাকাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফরাসি ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত এই শহরের নদীপাড়ের সৌন্দর্যায়ন পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বস্তিবাসীদের পাকা বাড়ি, নতুন করে তৈরি হতে পারে সরকারি আবাসন
শহরের কয়েকটি বড় বস্তি এলাকার উন্নয়নও এই মেগা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে বসবাসকারী মানুষের জন্য স্থায়ী পাকা আবাসন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সল্টলেকের কয়েকটি সরকারি আবাসন পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও পরিকল্পনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।
শুধু শহরাঞ্চল নয়, রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পথচারী ও পর্যটকদের সুবিধার জন্য আধুনিক পাবলিক টয়লেট তৈরির দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে এনবিসিসিকে।
কেন দায়িত্ব দেওয়া হল এনবিসিসিকে?
এই ন’টি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা এনবিসিসির সঙ্গে কাজ করবে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর। পাশাপাশি কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (KMDA) এবং স্টেট আরবান ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (SUDA)-কেও যুক্ত করা হচ্ছে।
পুরমন্ত্রীর বক্তব্য, কলকাতার সৌজন্য ও ধনধান্য অডিটোরিয়ামের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে এনবিসিসির। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই এবার একাধিক শহরের আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ন’টি মৌ চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পগুলির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিস্তারিত নকশা, অর্থ বরাদ্দ, জমি সংক্রান্ত বিষয় এবং সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে হকারদের পুনর্বাসন এবং গঙ্গার দুই তীরের উন্নয়ন প্রকল্প কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায়, তার উপরই নির্ভর করবে এই নগরায়ন পরিকল্পনার সাফল্য।



