ভারতীয় ক্রিকেটের লাল বলের অধ্যায়ে শেষ হল মহম্মদ শামির (Mohammed Shami) দীর্ঘ পথচলা। শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা করেছেন ভারতের অভিজ্ঞ পেসার। প্রায় ১৩ বছরের আন্তর্জাতিক টেস্ট কেরিয়ারে বল হাতে একাধিক স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন বাংলার এই ক্রিকেটার। চোটের কারণে বারবার মাঠের বাইরে যেতে হলেও প্রত্যাবর্তন করেছেন নিজের দক্ষতায়। দেশের মাটির পাশাপাশি বিদেশের কঠিন পরিবেশেও উইকেট তুলে নিয়ে ভারতকে সাফল্য এনে দিয়েছেন। তাঁর অবসরের পর ক্রিকেটপ্রেমীদের স্বাভাবিক প্রশ্ন, টেস্ট ক্রিকেটে কতগুলি উইকেট রয়েছে শামির ঝুলিতে? এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারের পরিসংখ্যান।
৬৪টি টেস্ট ম্যাচে শামির সংগ্রহ ২২৯ উইকেট
২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল মহম্মদ শামির। আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক ১৩ বছর পর একই দিনে লাল বলের ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি। ভারতের হয়ে মোট ৬৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন এই ডানহাতি পেসার। ১২২টি ইনিংসে বল করে তাঁর সংগ্রহ ২২৯টি উইকেট।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টেস্ট ক্রিকেটে শামির বোলিং গড় ২৭.৭১। ইকোনমি রেট ৩.৩১ এবং স্ট্রাইক রেট ৫০.২৮। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ৫০.২৮টি বল করার পর একটি করে উইকেট পেয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় পেস আক্রমণের অন্যতম ভরসা ছিলেন শামি।
টেস্ট কেরিয়ারে ছ’বার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব
শুধু উইকেট সংখ্যার নিরিখেই নয়, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ম্যাচের রং বদলে দেওয়ার ক্ষমতার জন্যও পরিচিত ছিলেন শামি। টেস্ট কেরিয়ারে মোট ছ’বার এক ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ১২ বার চার উইকেট নেওয়ার নজির রয়েছে তাঁর।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর সেরা ইনিংস বোলিং পারফরম্যান্স। একটি ইনিংসে ৫৬ রান দিয়ে ছ’টি উইকেট তুলে নিয়েছিলেন বাংলার এই পেসার। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং অর্ডারে চাপ তৈরি করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়াই ছিল তাঁর বোলিংয়ের অন্যতম বড় শক্তি।
অভিষেক টেস্টেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন নিজের ক্ষমতা
২০১৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ইডেন গার্ডেন্সে অভিষেক ম্যাচ থেকেই নজর কেড়েছিলেন শামি। প্রথম টেস্টেই দুই ইনিংস মিলিয়ে মোট ন’টি উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। নিজের শহরের মাঠে এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর পরিচিতি বাড়তে শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে ভারতীয় দলের পেস আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেন শামি। নতুন বলে সুইং করানো থেকে শুরু করে পুরনো বলে রিভার্স সুইং, দুই ক্ষেত্রেই তাঁর দক্ষতা ছিল নজরকাড়া। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে তাঁর ধারাবাহিকতা ভারতীয় দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
বিদেশের মাটিতেও ছিল শামির দাপট
ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে টেস্ট ক্রিকেট খেলা যে কোনও পেসারের কাছে বড় পরীক্ষা। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন শামি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২০১৮-১৯ সালের ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ে ভারতীয় বোলিং আক্রমণের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।
পুরনো বলে রিভার্স সুইং, নিখুঁত লাইন-লেংথ এবং দীর্ঘ স্পেলে বল করার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের উপর চাপ তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে বারবার কার্যকর হয়েছেন বাংলার এই পেসার।
ব্যাট হাতেও রয়েছে ৭৫০ রান, দুটি অর্ধশতরান
শামি মূলত বোলার হলেও টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাট হাতেও অবদান রেখেছেন। ৬৪টি টেস্ট ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ ৭৫০ রান। সর্বোচ্চ স্কোর ৫৬। রয়েছে দুটি অর্ধশতরানও।
লোয়ার অর্ডারে ব্যাট করতে নেমে বেশ কয়েকবার দলের রান বাড়াতে সাহায্য করেছেন তিনি। প্রয়োজনের সময় লড়াকু ব্যাটিং করে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নজিরও রয়েছে। ফলে তাঁর টেস্ট কেরিয়ারের পরিসংখ্যান শুধু বল হাতের সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
২০২৩ সালের পর আর টেস্ট খেলেননি শামি
মহম্মদ শামির শেষ টেস্ট ম্যাচ ছিল ২০২৩ সালের জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। লন্ডনের ওভালে আয়োজিত সেই ম্যাচের পর আর ভারতের টেস্ট দলে প্রত্যাবর্তন হয়নি তাঁর। চোট এবং ফিটনেস সংক্রান্ত সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে।
এরপর ঘরোয়া ক্রিকেট ও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন এই পেসার। কিন্তু টেস্ট দলে আর সুযোগ মেলেনি। অবশেষে ৬ নভেম্বর ২০২৬-এ টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্য দুই ফরম্যাট থেকে এখনই সরে দাঁড়াচ্ছেন না শামি। একদিনের আন্তর্জাতিক এবং টি-২০ ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। ফলে ভারতীয় জার্সিতে কিংবা ঘরোয়া সাদা বলের ক্রিকেটে ভবিষ্যতে তাঁকে দেখার সুযোগ থাকছে ক্রিকেটপ্রেমীদের।
৬৪টি টেস্ট, ২২৯টি উইকেট এবং ছ’বার পাঁচ উইকেট—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটে শামির অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর অধ্যায় শেষ হলেও ভারতীয় পেস বোলিংয়ের ইতিহাসে তাঁর নাম দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



