উপনির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিতে ফের প্রকাশ্যে তৃণমূল-কংগ্রেস তরজা। রাজ্যে কংগ্রেসের ভূমিকা এবং সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, শাসক দলের বাইরে কার্যকর বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হচ্ছে না। একইসঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।
কংগ্রেসের প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে নিশানা করে কল্যাণ বলেন, “অধীর বিক্রি হয়ে গিয়েছে, তাঁর একমাত্র কাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করা।” এটি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অভিযোগ। তাঁর মন্তব্য ঘিরেই নতুন করে তৃণমূল-কংগ্রেসের সংঘাত সামনে এসেছে।
কল্যাণের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। বাংলায় কংগ্রেস দুর্বল নয় বলে দাবি করে তিনি বলেন, “বাংলায় কংগ্রেস কোনওভাবেই দুর্বল নয়। ভোটে হেরেও কংগ্রেস কখনও অন্য কোথাও সরে যায়নি।” রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বক্তব্য, ধীরে ধীরে সবাই বুঝতে পারছেন রাহুল গান্ধী একটি ‘বটবৃক্ষ’, তাঁর ছায়াতেই সকলকে আসতে হবে।
এই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের আবহ তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন তৃণমূলের দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত
তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে নির্বাচন কমিশন ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং সংরক্ষিত ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক আপাতত ফ্রিজ করেছে। ৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের আগে দুই গোষ্ঠীকে আলাদা নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী পেয়েছে ‘Mamata All India Trinamool Congress’ নাম এবং ‘Football Player’ প্রতীক। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত হয়েছে ‘Democratic Trinamool Congress’ নাম এবং ‘Envelope’ প্রতীক।
এই সিদ্ধান্তের পর নন্দীগ্রামে মমতা-শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। পরে নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের কথা জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে ওই কেন্দ্রের সমীকরণও বদলে যায়।
অধীরের ‘বটবৃক্ষ’ মন্তব্যেও তৃণমূলকে নিশানা
এরই মধ্যে শুক্রবার কংগ্রেসের প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী কংগ্রেসকে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে তৃণমূলের সমালোচনাও ছিল। কংগ্রেসকে ‘বটবৃক্ষ’ বলে উল্লেখ করে তিনি বিজেপি-বিরোধী শক্তিগুলিকে কংগ্রেসের ছাতার তলায় আসার আহ্বান জানান।
অধীরের সেই বক্তব্যের পরই পাল্টা আক্রমণ শানান কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে নাম ও প্রতীক বিতর্কের পাশাপাশি কংগ্রেস বনাম তৃণমূলের পুরনো রাজনৈতিক সংঘাতও নতুন করে সামনে এসেছে।
রাহুলের প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় রাজনীতিতেও উত্তাপ
তৃণমূলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজের ঘটনায় জাতীয় স্তরেও প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন মিলে রাজনৈতিক দল ভাঙছে এবং পরে তাদের নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি এই ঘটনাকে ‘ভোট চুরি, সরকার চুরির পর এবার দল চুরি’ বলে অভিহিত করেন।
রাহুলের বক্তব্য, এই লড়াই শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নয়; অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান এমন রাজনৈতিক দল এবং ভোটারদেরও বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। তাঁর বক্তব্য অবশ্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই এসেছে; নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পটভূমি হল তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধ।
সব মিলিয়ে, ৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিতে একাধিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। তৃণমূলের নাম-প্রতীক বিতর্ক, প্রার্থী প্রত্যাহার এবং কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্য তরজা—সব মিলিয়ে আগামী দিনে দুই দলের সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



