কংগ্রেসের অন্দরে ‘ভোট চুরি’ ইস্যু নিয়ে সব নেতার সমর্থন এখনও এক জায়গায় এসেছে কি না, সেই প্রশ্নের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বার্তা দিলেন রাহুল গান্ধী। মঙ্গলবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি (CWC)-র বৈঠকে, সূত্রের দাবি অনুযায়ী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা বলেন, দলের কিছু নেতা এখনও তাঁর তোলা অভিযোগে পুরোপুরি আস্থা রাখছেন না। তাঁদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা—“আমার উপর বিশ্বাস রাখা শুরু করুন।”
দিল্লিতে হওয়া এই বৈঠকে মূল আলোচনার কেন্দ্রে ছিল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার Special Intensive Revision (SIR) এবং কংগ্রেসের ‘ভোট চুরি’ প্রচার। কংগ্রেসের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংস্থা CWC পরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক দাবি তোলে।
সূত্রের দাবি, বৈঠকে রাহুল গান্ধী সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে তাঁর একটি বৈঠকের প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে তাঁকে বলা হয়েছিল, বিজেপি ক্ষমতা হারালে কংগ্রেসই পরবর্তী সরকার গঠন করবে। সেই প্রসঙ্গ টেনে রাহুল প্রশ্ন করেন, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব যদি কংগ্রেসকে নিজেদের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখেন, তাহলে দলেরই কিছু নেতা তাঁর ‘ভোট চুরি’ প্রচারে এখনও আস্থা রাখছেন না কেন। এই বক্তব্যের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসেনি; Indian Express সূত্র উদ্ধৃত করে তা জানিয়েছে।
বৈঠকে কয়েকজন কংগ্রেস নেতা রাহুলের অবস্থানের প্রশংসা করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এরপর কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে তাঁকে সমর্থন করে জানান, দলের নেতৃত্ব তাঁর পাশে রয়েছে। সূত্রের দাবি, খড়্গে বলেন, গোটা দল রাহুলের সঙ্গে রয়েছে।
রাহুলের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল গত কয়েক মাস ধরে কংগ্রেসের চালানো ‘ভোট চুরি’ প্রচার। কংগ্রেস অভিযোগ করে আসছে, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। তবে এগুলি কংগ্রেসের অভিযোগ—নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা এই দাবিগুলিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
CWC বৈঠকের পরে কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অবস্থান আরও জোরদার করেছে। দলটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে, SIR স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে এবং তাদের হিসাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৩.৩ কোটি নাম পুনর্বহালের দাবি তুলেছে।
কংগ্রেসের এই দাবির পাশাপাশি কমিশনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন অতীতে SIR-সহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে তার সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্বের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। Form 6-এ SIR-সংক্রান্ত অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কেও কমিশন জানিয়েছে, SIR-এর সময়ের বাইরে নিয়ম অনুযায়ী statutory forms ব্যবহার করা হবে।
CWC বৈঠকে রাহুলের বার্তার তাৎপর্য
এই বৈঠকে রাহুলের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দলের অভ্যন্তরীণ সংশয় কাটিয়ে ‘ভোট চুরি’ প্রচারে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান। Indian Express-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাহুল মনে করিয়ে দেন যে তাঁর তোলা প্রশ্নগুলি নিয়ে শুরুতে দলের মধ্যেও সংশয় ছিল। এখন সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁর অবস্থানের পক্ষে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন—এটি তাঁর বক্তব্যের বর্ণনা, স্বাধীনভাবে যাচাই করা সিদ্ধান্ত নয়।
বৈঠকে রাহুলের বক্তব্যের পর খড়্গের সমর্থনও তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব ‘ভোট চুরি’ ইস্যুকে আরও জোরালো রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রচারে নিয়ে যাওয়ার অবস্থান নিয়েছে। CWC-র প্রস্তাবেও সেই অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে বৈঠকে শুধু প্রকাশ্য রাজনৈতিক আন্দোলনের কথাই ওঠেনি। রাজ্যসভা সাংসদ অভিষেক মনু সিংভি নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত বিষয়ে দলের অবস্থান জোরদার করার পক্ষে থাকলেও, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ‘Track-II’ আলোচনার পথ খোলা রাখার পরামর্শও দেন বলে Indian Express জানিয়েছে। একই সঙ্গে CEC-এর বিরুদ্ধে আইনি পথে যাওয়ার বিষয়ে তিনি সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, CWC-র বৈঠক থেকে কংগ্রেস যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি, SIR এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা। দলটি জানিয়েছে, এই বিষয়গুলি নিয়ে সংসদ, আদালত এবং রাস্তায় আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
ফলে মঙ্গলবারের CWC বৈঠকে রাহুল গান্ধীর “আমার উপর বিশ্বাস রাখা শুরু করুন” বার্তাটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে দলের নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য ছিল না; ‘ভোট চুরি’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও তা একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তবে ‘ভোট চুরি’ নিয়ে কংগ্রেসের অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও চলমান।



