আগামী কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar)। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং ইরান-গাল্ফ অঞ্চলের সংঘাতের জেরে খাদ্যশস্যের সরবরাহ, সার উৎপাদন ও জ্বালানি বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ‘সুপার এল নিনো’-র আশঙ্কা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
২৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে Asia Society আয়োজিত এক আলোচনায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং Global South-এর পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন জয়শঙ্কর। সেখানেই তিনি বলেন, ইউক্রেন এবং ইরান-গাল্ফ সংঘাতের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতিতে গুরুতরভাবে পড়ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খাদ্য, জ্বালানি, সার এবং অর্থ—এই চারটি ক্ষেত্রেই একসঙ্গে চাপ তৈরি হচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর জানান, বিশ্বের কয়েকটি বড় খাদ্যশস্য রফতানিকারক দেশ তাদের পণ্য নির্দিষ্ট বাজারে পাঠাতে সমস্যায় পড়তে পারে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর (Black Sea) দিয়ে শস্য পরিবহণ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ। জয়শঙ্করের বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়া এবং রাশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সার উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হলে কৃষিক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু যুদ্ধ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যাই নয়, আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়েও সতর্ক করেছেন বিদেশমন্ত্রী। সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’-র প্রভাব খাদ্য উৎপাদনের উপর পড়লে বর্তমান চাপ আরও বাড়তে পারে বলে তাঁর বক্তব্য। উল্লেখ্য, ‘সুপার এল নিনো’ কোনও আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিভাগ নয়; অত্যন্ত শক্তিশালী El Niño পরিস্থিতি বোঝাতে শব্দটি অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা হয়।
El Niño হল প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে যুক্ত একটি জলবায়ুগত ঘটনা, যার প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার উপর পড়তে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর সম্ভাব্য প্রভাব কৃষি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জয়শঙ্করের আশঙ্কার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জ্বালানি বাজারও। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ইতিমধ্যেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে তেল সরবরাহকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন বাড়লে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল করার বদলে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিদেশমন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে শুধু খাদ্য বা জ্বালানির পৃথক সমস্যা হিসেবে দেখেননি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত একাধিক অর্থনৈতিক চাপের কথা। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের অর্থ সাধারণত তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে সরে যায়। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর খাদ্য ও জ্বালানির চাপের পাশাপাশি অর্থের জোগান নিয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
Global South বলতে মূলত এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু উন্নয়নশীল ও অপেক্ষাকৃত কম উন্নত অর্থনীতিকে বোঝানো হয়। জয়শঙ্করের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, বড় শক্তিগুলির ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতেও তার পরোক্ষ প্রভাব পড়ে।
এই প্রসঙ্গেই দেশগুলির নীতিনির্ধারণে আরও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রভাব বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, একটি দেশের সিদ্ধান্তের অনিচ্ছাকৃত প্রভাব অন্য দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের উপর পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
জয়শঙ্কর একইসঙ্গে ভারতের আশপাশের দেশগুলিতে ইউক্রেন যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর আশঙ্কা, ইরান ও গাল্ফ অঞ্চলের বর্তমান সংঘাতের প্রভাব যদি আরও ছড়ায়, তাহলে সেই অস্থিরতা বাড়তে পারে।
তবে বিদেশমন্ত্রীর এই বক্তব্য একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা—বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, এমন কোনও ঘোষণা নয়। খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ, সার উৎপাদন, জ্বালানি বাজার এবং আগামী দিনের আবহাওয়ার পরিস্থিতি—এই একাধিক বিষয়ের গতিপথের উপরই বাস্তব পরিস্থিতি নির্ভর করবে।



