১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার পর বড় সিদ্ধান্ত, ‘বাদ পড়া’ ভোটারদের ফেরাতে বিশেষ অভিযান কমিশনের

SIR শেষ ২০ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ অভিযান, ‘বাদ পড়া’ ভোটার ও নতুন ভোটারদের সাধারণ Form 6-এ নাম তোলার সুযোগ

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

Special Intensive Revision বা SIR-এর খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়ার পর ‘বাদ পড়া’ ভোটারদের ফেরাতে বিশেষ অভিযান শুরু করার নির্দেশ দিল নির্বাচন কমিশন। SIR শেষ হয়ে যাওয়া ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন ভোটার এবং SIR-এর সময় তালিকায় জায়গা না পাওয়া যোগ্য ভোটারদেরও এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।

কমিশনের ২৯ সেপ্টেম্বরের নির্দেশ বৃহস্পতিবার রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে ফের জানানো হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, Chief Electoral Officer, District Election Officer এবং Electoral Registration Officer-দের মাধ্যমে এই বিশেষ অভিযান চালানো হবে। উদ্দেশ্য—SIR-এর পরে তালিকায় বাদ পড়ে যাওয়া যোগ্য ভোটারদের চিহ্নিত করে তাঁদের ফের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল Form 6। SIR শেষ হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলিতে ‘left out’ ভোটার এবং প্রথমবার ভোট দিতে চলা তরুণদের সাধারণ বিধিবদ্ধ Form 6-এর মাধ্যমে নাম তোলার সুযোগ দেওয়া হবে। অর্থাৎ, SIR চলাকালীন Form 6-এ যে অতিরিক্ত ঘোষণা সংক্রান্ত প্রশ্ন যোগ করা হয়েছিল, SIR শেষ হওয়ার পরে সেই প্রশ্ন আর প্রযোজ্য হবে না।

কমিশনের এই সিদ্ধান্তের পিছনে SIR-এর সময় বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। The Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, তিন দফায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকায় ১৩.৩৭ কোটি নাম বাদ পড়েছিল, যা সংশ্লিষ্ট প্রি-SIR তালিকার প্রায় ১৪.১ শতাংশ। তবে এই সংখ্যা ভুল ভাবে বাদ পড়া ১৩ কোটি যোগ্য ভোটারকে বোঝায় না—খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট বা অন্য কারণে অযোগ্য নামও থাকতে পারে।

এবার কমিশনের নির্দেশে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে বলা হয়েছে। SIR-এর আগে এবং পরে প্রকাশিত ভোটার তালিকা মিলিয়ে দেখতে হবে। কোন কোন নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে কারও নাম অন্যত্র রয়েছে কি না, কেউ মৃত বা ডুপ্লিকেট কি না—এসব যাচাই করে ‘left out’ ভোটারদের চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ভোটারের বাড়িতে গিয়ে Form 6 পূরণ করানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এই কাজে রাজনৈতিক দলগুলির বুথ-স্তরের প্রতিনিধিদের সাহায্য নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে SIR প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। The Indian Express-এর সাম্প্রতিক তদন্ত অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটার বাদ দেওয়া এবং ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়েও তাঁদের আপত্তি ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে Form 6-এ SIR-সংক্রান্ত অতিরিক্ত প্রশ্ন যোগ করার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জুলাইয়ে অনলাইন Form 6-এ আবেদনকারীকে তাঁরা বা তাঁদের বাবা-মা আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় ছিলেন কি না, সে বিষয়ে উত্তর দিতে হত। এমন পরিস্থিতিতে কোনও ১৮ বছর বয়সি ভোটারের বাবা-মায়ের নাম আগের তালিকায় না থাকলে তাঁর সামনে সমস্যার তৈরি হতে পারত। ২৯ সেপ্টেম্বরের নির্দেশে কমিশন স্পষ্ট করেছে, এই অতিরিক্ত ঘোষণা শুধুমাত্র SIR পর্যায়েই প্রযোজ্য হবে। SIR শেষ হলে ১৯৬০ সালের Registration of Electors Rules অনুযায়ী সাধারণ ফর্ম ব্যবহার করা হবে।

কমিশনের এই পদক্ষেপের সঙ্গে সম্প্রতি ECINET নিয়েও ওঠা প্রশ্নের যোগ রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে কমিশন জানিয়েছিল, ‘unmapped’ এবং ‘logical discrepancies’-এর কারণে যাঁদের নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেককে ব্যক্তিগত ভাবে শুনানিতে হাজির হতে হবে না। বুথ লেভেল অফিসাররা বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে তা ECINET-এ আপলোড করতে পারবেন। পাশাপাশি ECINET পর্যালোচনার জন্য স্বাধীন IIT/IIIT বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করার কথাও জানানো হয়েছিল।

বাংলার ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে SIR ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ‘left out’ ভোটারদের জন্য কমিশনের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী সাধারণ Form 6-এর মাধ্যমে নাম অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকছে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে SIR-এ নাম বাদ যাওয়া বা অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিপুল সংখ্যক আবেদন ও আপিল ইতিমধ্যেই জমা পড়েছে। সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে Indian Express জানিয়েছিল, রাজ্যে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ৩৮.২০ লক্ষ আপিলের মধ্যে মাত্র ১.০২ লক্ষ তখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—১৩ কোটি নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে মানেই ১৩ কোটি যোগ্য ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এমন দাবি এই তথ্য থেকে করা যায় না। খসড়া তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট বা অযোগ্য নামও বাদ পড়তে পারে। নতুন বিশেষ অভিযানের লক্ষ্য হল সেই বাদ পড়া নামগুলির মধ্যে যোগ্য অথচ সত্যিই তালিকার বাইরে থেকে যাওয়া ভোটারদের চিহ্নিত করে ফের অন্তর্ভুক্ত করা।

এখন নজর থাকবে এই বিশেষ অভিযানে রাজ্য নির্বাচন দফতরগুলি কী ভাবে বাদ পড়া ভোটারদের শনাক্ত করে এবং কত জনের নাম Form 6-এর মাধ্যমে ফের ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়। বিশেষ করে SIR শেষ হওয়া ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রক্রিয়ার বাস্তব প্রয়োগই আগামী দিনে বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন