ভারতীয় টাকার নোট হাতে নিলে একটি মুখ প্রায় সবারই চেনা—মহাত্মা গান্ধীর। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই ভারতীয় নোটে গান্ধীর ছবি ছিল না। এমনকি স্বাধীন ভারতের প্রথম নকশা তৈরির সময় গান্ধীর ছবি রাখার কথা ভাবা হলেও শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয়েছিল সারনাথের অশোকস্তম্ভের সিংহমূর্তি। তাহলে আজকের নোটে দেখা গান্ধীর সেই পরিচিত মুখ এল কোথা থেকে? আর যে ছবিকে ভিত্তি করে এই প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছিল, তার পিছনের গল্পই বা কী?
ভারতীয় নোটে গান্ধীর মুখ আসার ইতিহাস আসলে স্বাধীনতার কয়েক দশক পরের। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কিছু সময় ব্রিটিশ আমলের নোট চালু ছিল। সেই নোটগুলিতে ছিল রাজা ষষ্ঠ জর্জের প্রতিকৃতি। স্বাধীন ভারতের নিজস্ব মুদ্রার নকশা তৈরির সময় তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি ছিল—ঔপনিবেশিক প্রতীক সরিয়ে নতুন ভারতের পরিচয় কীভাবে ফুটিয়ে তোলা হবে?
১৯৪৯ সালে সরকার নতুন এক টাকার নোটের নকশা প্রকাশ করে। সেখানে রাজা ষষ্ঠ জর্জের জায়গায় জলছাপের ঘরে আসে সারনাথের অশোকস্তম্ভের সিংহমূর্তি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে গান্ধীর প্রতিকৃতি ব্যবহারের কথা ভাবা হয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী নকশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যায় অশোকস্তম্ভের পক্ষে।
এর পরের কয়েক দশকেও ভারতীয় নোটের নকশায় দেশের বিভিন্ন প্রতীককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোথাও বাঘ ও হরিণের মতো প্রাণী, কোথাও কৃষিকাজ, আবার কোথাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ছবি জায়গা নেয়। অর্থাৎ নোটের ছবি শুধু অলঙ্করণ ছিল না; সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া ভারতের পরিচয়ও সেখানে তুলে ধরা হত।
গান্ধীর ছবি প্রথম কবে নোটে এল?
এখানেই গল্পে আসে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ নোটের একটি সিরিজ প্রকাশ করা হয়। সেই নোটে গান্ধীর ছবি ছিল এবং পিছনে ছিল সেবাগ্রাম আশ্রমের দৃশ্য। অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় গান্ধীর ছবি প্রথম আসে একটি বিশেষ স্মারক সিরিজের মাধ্যমে।
এরপর ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে ₹৫০০-এর নোটে গান্ধীর প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়। সেই নোটে অবশ্য অশোকস্তম্ভের প্রতীকও ছিল। ফলে তখনও গান্ধীর ছবি সব denomination-এর নোটের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠেনি।
তাহলে আজকের পরিচিত গান্ধীর মুখটি কোথা থেকে এল?
এটাই এই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ।
ভারতীয় নোটে ব্যবহৃত গান্ধীর প্রতিকৃতিটি কোনও শিল্পীর কল্পনা থেকে আঁকা ছবি নয়। এটি একটি বাস্তব আলোকচিত্র থেকে তৈরি। Indian Express-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ছবিটি ১৯৪৬ সালে তোলা হয়েছিল। সেই ছবিতে গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিক লর্ড ফ্রেডরিক উইলিয়াম পেথিক-লরেন্স। ছবির মধ্যে গান্ধীর যে অভিব্যক্তি ছিল, সেটিই নোটের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। পরে সেই ছবির অংশ থেকে প্রতিকৃতি তৈরি করা হয় এবং নোটে ব্যবহারের জন্য সেটিকে mirror image হিসেবে রূপ দেওয়া হয়।
তবে এই ছবির উৎস নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মাথায় রাখা দরকার। Indian Express-এর ২০২৩ সালের আর্কাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই নির্দিষ্ট ছবির আলোকচিত্রী এবং ছবিটি কে বেছে নিয়েছিলেন—তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ২০২৬ সালের একটি Indian Express Explainer-এ ছবিটির আলোকচিত্রী হিসেবে হোমাই ভ্যারাওয়াল্লার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই নির্দিষ্ট attribution-টি নিয়ে প্রকাশ্য সূত্রে ভিন্ন তথ্য রয়েছে; নিশ্চিতভাবে বলা যায়, নোটের প্রতিকৃতিটি ১৯৪৬ সালের ওই ছবির ভিত্তিতে তৈরি।
১৯৯৬ সালে কী বদলাল?
নব্বইয়ের দশকে নোট জাল করার প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছিল। ডিজিটাল প্রিন্টিং, স্ক্যানিং, ফটোগ্রাফি এবং জেরক্সের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় পুরনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
এই সময় একটি মানুষের মুখকে নোটের গুরুত্বপূর্ণ security feature হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। RBI-র নথিতে বলা হয়েছে, মানবমুখের সূক্ষ্ম রেখা, আলো-ছায়া এবং গভীর engraving-এর কারণে এমন প্রতিকৃতি নকল করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৯৬ সালে RBI Mahatma Gandhi Series চালু করে। এই সিরিজে নোটের সামনের দিকে গান্ধীর প্রতিকৃতি স্থায়ীভাবে জায়গা নেয় এবং অশোকস্তম্ভকে অন্য অবস্থানে রাখা হয়। পাশাপাশি security thread, latent image, intaglio printing-সহ একাধিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়।
এর পর থেকে গান্ধীর মুখ ভারতীয় নোটের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। ২০১৬ সালে RBI Mahatma Gandhi (New) Series চালু করলেও গান্ধীর প্রতিকৃতি রাখা হয়। নতুন সিরিজে নোটের নকশা ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনা হয়, কিন্তু পরিচিত মুখটি থেকে যায়।
আজ আমরা যে গান্ধীর মুখটি নোটে দেখি, তাই কোনও একদিন হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল নয়। এর পিছনে রয়েছে স্বাধীন ভারতের মুদ্রা-পরিচয় তৈরির দীর্ঘ প্রক্রিয়া—প্রথমে রাজা ষষ্ঠ জর্জের প্রতিকৃতি, তারপর অশোকস্তম্ভ, এরপর বিশেষ স্মারক নোটে গান্ধীর উপস্থিতি, ১৯৮৭ সালে ₹৫০০ নোটে তাঁর প্রতিকৃতি এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে Mahatma Gandhi Series-এর মাধ্যমে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া।
আর সেই পরিচিত মুখটির শিকড়? ১৯৪৬ সালের একটি আলোকচিত্রে—যেখানে গান্ধী দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিক পেথিক-লরেন্সের সঙ্গে। কয়েক দশক পরে সেই ছবির একটি অংশই হয়ে ওঠে এমন এক প্রতিকৃতি, যা ভারতীয়রা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার নোটে দেখে আসছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ভারতীয় নোটে গান্ধীর ছবি শুধু পরিচয়ের প্রতীক নয়, এর সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত। RBI জানিয়েছে, Mahatma Gandhi Series-এর নোটে তাঁর প্রতিকৃতি ও watermark-সহ একাধিক security feature ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে পরিচিত মুখটি একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয় এবং জাল নোট প্রতিরোধের নকশার অংশ হয়ে ওঠে।



