প্রেমের দেবী থেকে যৌনতার প্রতীক, কেন বিতর্কের কেন্দ্রে গ্রিক পুরাণের অ্যাফ্রোদিতি?

গ্রিক পুরাণের অ্যাফ্রোদিতি প্রেম, সৌন্দর্য ও উর্বরতার দেবী। প্রাচীন গ্রিসের নগ্ন ভাস্কর্য থেকে রেনেসাঁসের চিত্রকলা পর্যন্ত তাঁর রূপ কীভাবে নারীদেহ ও যৌনতা নিয়ে বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠল, সেই ইতিহাসের খোঁজ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

প্রাচীন গ্রিক পুরাণে প্রেম, সৌন্দর্য ও আকর্ষণের দেবী অ্যাফ্রোদিতি (Aphrodite)। কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে তাঁর পরিচয় শুধু প্রেমের দেবী হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিল্পকলায় নগ্ন নারীদেহের উপস্থাপনা, যৌনতার ধারণা এবং নারীকে দর্শকের আকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে দেখার বিতর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছে তাঁর নাম। অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামে (Ashmolean Museum) অ্যাফ্রোদিতিকে ঘিরে নতুন প্রদর্শনী সেই দীর্ঘ ইতিহাসকে ফের সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে এক বহুমাত্রিক প্রাচীন দেবী পাশ্চাত্য শিল্পে প্রেম ও যৌনতার অন্যতম বিতর্কিত প্রতীকে পরিণত হলেন?

অ্যাফ্রোদিতির ইতিহাস বুঝতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, প্রাচীন গ্রিসে প্রেম ও সৌন্দর্যের ধারণা আজকের মতো আলাদা করে দেখা হত না। তাঁর সঙ্গে জড়িত ছিল যৌন আকর্ষণ, প্রজনন, বিবাহ এবং প্রকৃতির উর্বরতাও। প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নারীদেবীর উপাসনার সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের নানা যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন ইতিহাসবিদেরা। ফলে তাঁকে কেবল যৌনতার প্রতীক হিসেবে দেখলে তাঁর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়।

অ্যাফ্রোদিতির উপাসনার প্রাচীন কেন্দ্রগুলির মধ্যে সাইপ্রাস (Cyprus) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগ থেকেই সেখানে তাঁর উপাসনার চিহ্ন পাওয়া যায় বলে গবেষকেরা মনে করেন। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের ইশতার (Ishtar) এবং আস্তার্তে (Astarte)-র মতো দেবীদের সঙ্গে অ্যাফ্রোদিতির বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। এই দেবীদের ক্ষেত্রেও প্রেম, যৌনতা ও উর্বরতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁদের প্রত্যেকের ধর্মীয় পরিচয় ও ভূমিকা এক ছিল না।

অ্যাফ্রোদিতির পরিচয়ের মোড় ঘোরানো অধ্যায় আসে শিল্পকলায়। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩৫০ অব্দে গ্রিক ভাস্কর প্রাক্সিতেলিস (Praxiteles) তৈরি করেন তাঁর বিখ্যাত Aphrodite of Knidos ভাস্কর্য। কোনও দেবীর সম্পূর্ণ নগ্ন নারীদেহকে এ ভাবে শিল্পের কেন্দ্রে তুলে ধরার ঘটনা প্রাচীন গ্রিক শিল্পে ছিল অত্যন্ত অভিনব। মূল ভাস্কর্যটি আজ আর নেই, তবে পরবর্তী রোমান অনুকৃতি থেকে তার রূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

এই ভাস্কর্যের বিশেষত্ব শুধু নগ্নতা ছিল না, ছিল শরীরের উপস্থাপনাও। অ্যাফ্রোদিতিকে দেখানো হয়েছিল স্নানের মুহূর্তে, যেন আচমকা কারও উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি নিজের শরীর আড়াল করতে চাইছেন। তাঁর ভঙ্গিতে লজ্জা ও অসহায়তার ইঙ্গিত থাকলেও, দর্শকের দৃষ্টির জন্য শরীরের বিভিন্ন অংশ উন্মুক্ত থেকে যায়। শিল্পকলার ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিন্যাসই নারীদেহকে দেখার এবং তাকে সৌন্দর্যের মানদণ্ডে বিচার করার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিল।

এর পর থেকে অ্যাফ্রোদিতির নগ্ন রূপ ইউরোপীয় শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। রোমান শিল্পে তিনি পরিচিত হন ভেনাস (Venus) নামে। রেনেসাঁসের সময় শিল্পীরা আবার গ্রিক-রোমান পুরাণের বিষয়গুলিকে নতুন করে আঁকতে শুরু করেন। সেই ধারায় নগ্ন নারীদেহের সৌন্দর্য, কামনা ও দর্শকের দৃষ্টির সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অ্যাফ্রোদিতি বা ভেনাস তাই শুধু পুরাণের চরিত্র রইলেন না, হয়ে উঠলেন শিল্পে নারীদেহের উপস্থাপনা নিয়ে বিতর্কেরও কেন্দ্র।

এই বিতর্কের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দিয়েগো ভেলাসকেসের (Diego Velázquez) আঁকা Rokeby Venus। সপ্তদশ শতকের এই চিত্রে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখছেন এক নগ্ন নারী। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সুফ্রাজেট মেরি রিচার্ডসন (Mary Richardson) লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে প্রদর্শিত ছবিটিকে কসাইয়ের ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তাঁর এই পদক্ষেপকে ছবির নারীদেহের উপস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, শিল্পের সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা কখনও কখনও ক্ষমতা, নারী অধিকার এবং সামাজিক নীতিবোধের প্রশ্নেও পৌঁছে যায়।

তবে অ্যাফ্রোদিতির পরিচয়কে শুধু কামনা বা সৌন্দর্যে আটকে রাখা যায় না। গ্রিক পুরাণে ট্রয়ের যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণের কাহিনি রয়েছে। সমুদ্রযাত্রা ও নৌবাহিনীর সঙ্গেও কিছু অঞ্চলে তাঁর উপাসনার যোগ ছিল। আরেকটি পুরাণকথায় ট্রয়ের রাজপুত্র আনকিসিসের (Anchises) সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থেকে জন্ম নেয় এনিয়াস (Aeneas), যাঁর বংশধরদের রোম নগরীর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রেমের দেবী হওয়ার পাশাপাশি তাঁর চরিত্রে যুদ্ধ, বংশপরম্পরা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের উপাদানও ছিল।

অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামের Aphrodite: The Making of a Goddess প্রদর্শনীতে এই বিবর্তনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রাচীন ভাস্কর্য ও প্রত্নবস্তু থেকে শুরু করে রেনেসাঁসের চিত্রকলা এবং আধুনিক সংস্কৃতিতে ভেনাসের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে প্রদর্শনীটি দেখায়, কীভাবে এক দেবীর রূপ ও অর্থ সময়ের সঙ্গে বদলেছে। প্রদর্শনীটি ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চলার কথা।

অ্যাফ্রোদিতিকে ঘিরে বিতর্কের মূল প্রশ্ন তাই তাঁর নগ্নতা নয়, বরং সেই নগ্নতাকে কোন দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। এক দিকে তা সৌন্দর্য, সৃষ্টিশীলতা ও মানবদেহের উদ্‌যাপন; অন্য দিকে নারীকে কেবল দর্শকের কামনার বস্তু করে তোলার আশঙ্কা। কয়েক হাজার বছর ধরে বদলে যাওয়া এই ব্যাখ্যাই অ্যাফ্রোদিতিকে আজও শিল্প, ইতিহাস ও লিঙ্গ-রাজনীতির আলোচনায় প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন