পোড়া বা অতিরিক্ত কড়া করে ভাজা খাবার অনেকেরই পছন্দ। কিন্তু নিয়মিত এমন খাবার খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বেশি তাপে রান্না করা আলু, পাউরুটি বা টোস্টের মতো খাবারে তৈরি হতে পারে অ্যাক্রিলামাইড (Acrylamide)। এই রাসায়নিক নিয়ে ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি-সহ একাধিক স্বাস্থ্যগত আশঙ্কা রয়েছে। তবে খাবারে থাকা অ্যাক্রিলামাইড এবং মানুষের ক্যানসারের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিয়ে দাবিগুলি সতর্কতার সঙ্গে দেখা জরুরি।
উচ্চ তাপমাত্রায় স্টার্চসমৃদ্ধ খাবার রান্না, ভাজা বা বেক করার সময় অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হতে পারে। আলু ভাজা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস, রুটি বা টোস্টের মতো খাবারে তাই এই রাসায়নিকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি (EFSA)-র মূল্যায়নে অ্যাক্রিলামাইডকে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাণীর উপর গবেষণায় অ্যাক্রিলামাইড ও ক্যানসারের যোগসূত্র পাওয়া গেলেও, মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রার ঝুঁকি প্রমাণিত হয়েছে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। তবে খাবারের মাধ্যমে এই রাসায়নিকের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অ্যাক্রিলামাইড নিয়ে উদ্বেগের আর একটি কারণ হল স্নায়ুতন্ত্র। উচ্চমাত্রায় এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে স্নায়ুর ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অ্যাক্রিলামাইড শরীরে প্রবেশ করলে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।
গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রেও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অ্যাক্রিলামাইড শরীরে শোষিত হয়ে রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ভ্রূণের কাছেও পৌঁছতে পারে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তাই গর্ভবতী মহিলাদের অতিরিক্ত পোড়া বা খুব বেশি ভাজা খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আলু, পাউরুটি বা ভাজা খাবার পুরোপুরি খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন করলেই অ্যাক্রিলামাইডের মাত্রা কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, খাবারকে গাঢ় বাদামি বা কালো করে না ভেজে হালকা সোনালি রঙ হওয়া পর্যন্ত রান্না করা উচিত।
বিশেষ করে আলু ভাজার আগে কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে রাখার অভ্যাস উপকারী হতে পারে। এতে আলুর পৃষ্ঠে থাকা কিছু শর্করা কমে যায়, যা উচ্চ তাপে অ্যাক্রিলামাইড তৈরির অন্যতম উপাদান। ফলে রান্নার সময় এই রাসায়নিকের পরিমাণ কমানো সম্ভব।
পাউরুটি বা টোস্ট বেশি পুড়ে গেলে কালো অংশটি না খাওয়াই ভালো। ছুরি দিয়ে অতিরিক্ত পোড়া অংশ সরিয়ে ফেলে বাকি অংশ খাওয়া যেতে পারে। একই ভাবে চিপস বা ভাজাভুজি অতিরিক্ত গাঢ় হয়ে গেলে তা নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস এড়ানো উচিত।
অর্থাৎ, ‘পোড়া খাবার খেলেই ক্যানসার হবে’—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক ভাবে বলা ঠিক নয়। কিন্তু অতিরিক্ত তাপে তৈরি অ্যাক্রিলামাইডের সংস্পর্শ কমানো যে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, তা নিয়ে সতর্ক থাকা যায়। খাবার একেবারে বন্ধ করার বদলে রান্নার তাপমাত্রা, সময় এবং খাবারের রং—এই তিনটির দিকে নজর রাখলেই ঝুঁকি কমানোর পথে এগোনো সম্ভব।



