পুজোর সাজে নতুন হেয়ার কালার এখন অনেকেরই পছন্দ। কিন্তু ঘন ঘন হেয়ার ডাই ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে বেশ কিছু গবেষণায় উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন নিয়মিত হেয়ার ডাই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি—যদিও চুলে রং করালেই ক্যান্সার হবে, এমন সরাসরি প্রমাণ এখনও নেই।
পুজো আসতেই পোশাক, মেকআপ ও হেয়ারস্টাইল নিয়ে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কালো চুলে লাল, নীল, বেগুনি কিংবা অন্য কোনও রং এনে সম্পূর্ণ নতুন লুক তৈরি করার প্রবণতাও বেড়েছে। একবার-দু’বার চুলে রং করার বিষয়টি আর নিয়মিত ব্যবহারের মধ্যে কিন্তু যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
চুলের রং নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এর রাসায়নিক উপাদানকে ঘিরে। কিছু হেয়ার ডাইয়ে এমন রাসায়নিক থাকে, যেগুলির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ত্বক ও স্ক্যাল্পের সংস্পর্শে আসা এই রাসায়নিকগুলির শরীরে প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (National Institutes of Health)-এর অধীন একটি গবেষণায় হেয়ার ডাই ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের সম্ভাব্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছিল। গবেষণাটিতে ৪৬ হাজারের বেশি মহিলার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে ঘন ঘন হেয়ার ডাই ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির একটি সম্পর্ক দেখা গিয়েছিল।
বিশেষ করে ‘সিস্টার স্টাডি’ (Sister Study)-র তথ্য নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাটি এই বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় আনে। সেখানে স্থায়ী বা Permanent Hair Dye এবং ব্যবহারের ঘনত্বের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্ভাব্য সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল। তবে এই ধরনের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা কোনও একটি কারণ সরাসরি ক্যান্সার ঘটায়—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে না।
হেয়ার ডাই নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এর রাসায়নিক উপাদান। বিভিন্ন ধরনের ডাইয়ে অ্যারোম্যাটিক অ্যামাইন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডসহ নানা রাসায়নিক থাকতে পারে। সব পণ্যের উপাদান এক নয় এবং বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক ফর্মুলেশন আগের তুলনায় পরিবর্তিত হয়েছে। তাই ‘সব হেয়ার ডাইতেই ক্যান্সার-সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে’—এমন দাবি করাও সঠিক নয়।
ফর্ম্যালডিহাইড (Formaldehyde) নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যঝুঁকির আলোচনা রয়েছে। তবে সাধারণ হেয়ার ডাই এবং ফর্ম্যালডিহাইডের ব্যবহারকে এক করে দেখা ঠিক নয়। কিছু হেয়ার-স্মুথিং বা স্ট্রেটেনিং পদ্ধতিতে ফর্ম্যালডিহাইড বা ফর্ম্যালডিহাইড-রিলিজিং রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—চুলে রং করানোর সঙ্গে ক্যান্সারের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণার ফল সবসময় এক নয়। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও অন্য গবেষণায় সেই সম্পর্ক স্পষ্ট নয়। ফলে শুধুমাত্র হেয়ার ডাই ব্যবহারকে স্তন ক্যান্সারের সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।
তবে সতর্কতা অবলম্বন করা যায়। নিয়মিত বা ঘন ঘন হেয়ার কালার করার বদলে ব্যবহারের ব্যবধান বাড়ানো যেতে পারে। কোনও পণ্য ব্যবহারের আগে তার উপাদান ও নির্দেশিকা ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত। স্ক্যাল্পে কাটা, ঘা, র্যাশ বা জ্বালা থাকলে চুলে ডাই না করাই ভালো।
হেয়ার কালার করার আগে প্যাচ টেস্ট করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নতুন কোনও ব্র্যান্ড বা ফর্মুলা ব্যবহার করলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশ অনুযায়ী অ্যালার্জি টেস্ট করে নেওয়া উচিত। চোখ বা ত্বকের সংস্পর্শে ডাই এলে দ্রুত পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
পার্লার বা স্যালনে চুল রং করানোর সময়ও সতর্কতা প্রয়োজন। হেয়ার স্টাইলিস্টদের উপযুক্ত গ্লাভস ব্যবহার করা এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল রয়েছে এমন জায়গায় কাজ করা উচিত। গ্রাহকের ক্ষেত্রেও চেষ্টা করা ভালো যাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় রাসায়নিক স্ক্যাল্পে লেগে না থাকে।
পুজোর আগে চুলে নতুন রং করার ইচ্ছে থাকতেই পারে। কিন্তু সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। হেয়ার ডাই সরাসরি স্তন ক্যান্সার ঘটায়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই, তবে ঘন ঘন ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চলেছে। তাই অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো, পণ্যের উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কোনও অস্বাভাবিক ত্বকের প্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।



