ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান যে ক্যান্সারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি, তা কমবেশি সকলেরই জানা। কিন্তু প্রতিদিনের আরও একটি অভ্যাস নিয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন—অত্যন্ত গরম চা বা কফি পান করা। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এখানে আসল সমস্যা চা বা কফি নয়, বরং পানীয়টির তাপমাত্রা। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা IARC ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পান করা ‘ভেরি হট বেভারেজ’-কে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যান্সার-ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সম্প্রতি ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রিয়ম বরদলই তাঁর ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে একটি MCQ পোস্ট করে এই বিষয়টি সামনে আনেন। সেখানে কয়েকটি দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যে কোনটি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তা জানতে চাওয়া হয়। অপশনগুলির মধ্যে ছিল আন্ডারআর্মে ডিওডোরেন্ট ব্যবহার, পকেটে মোবাইল রাখা, নিয়মিত অত্যন্ত গরম চা বা কফি পান এবং মাইক্রোওয়েভে খাবার পুনরায় গরম করা।
তবে এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। সাধারণ গরম চা বা কফি পান করলেই ক্যান্সার হবে, এমন দাবি বৈজ্ঞানিক ভাবে ঠিক নয়। IARC-এর মূল্যায়নে মূলত ৬৫°C-এর বেশি তাপমাত্রায় পান করা অত্যন্ত গরম পানীয়ের সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যান্সারের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
অতিরিক্ত গরম পানীয় কেন উদ্বেগের?
খুব বেশি গরম তরল বারবার পান করলে খাদ্যনালির অভ্যন্তরের টিস্যুতে তাপজনিত ক্ষতি হতে পারে। এই ধরনের বারবার আঘাত ও প্রদাহ কোষের স্বাভাবিক কার্যপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কোষ প্রতিস্থাপনের জন্য শরীরকে বারবার নতুন কোষ তৈরি করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চললে কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন জমার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
IARC-এর গবেষণা পর্যালোচনাতেও অত্যন্ত গরম পানীয় এবং খাদ্যনালির ক্যান্সারের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাপমাত্রা যত বেশি, ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কও তত বেশি দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি পানীয়টির ধরন অপেক্ষা তার তাপমাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত বলেই গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গবেষণায় বিশেষ করে খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা (Oesophageal Squamous Cell Carcinoma)-র সঙ্গে অত্যন্ত গরম পানীয়ের সম্পর্ক নিয়ে তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে IARC স্পষ্ট করেছে, এখনও পর্যন্ত কত শতাংশ খাদ্যনালির ক্যান্সারের ঘটনা অত্যন্ত গরম পানীয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
৬৫°C-এর বেশি হলেই ‘ভেরি হট’?
IARC-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ৬৫°C-এর বেশি তাপমাত্রায় পান করা পানীয়কে ‘very hot’ হিসেবে ধরা হয়। এই তাপমাত্রায় নিয়মিত পানীয় খাওয়ার সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যান্সারের সম্ভাব্য যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ২০১৬ সালে IARC অত্যন্ত গরম পানীয়কে Group 2A বা ‘probably carcinogenic to humans’ শ্রেণিতে রেখেছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এক কাপ অত্যন্ত গরম চা খেলেই ক্যান্সার হয়ে যাবে। IARC নিজেই জানিয়েছে, কতটা পরিমাণ বা কত বছর ধরে এমন পানীয় পান করলে ক্যান্সার হবে, সেই নির্দিষ্ট মাত্রা এখনও জানা নেই। একই সঙ্গে এই শ্রেণিবিন্যাস ঝুঁকির মাত্রা নয়, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের শক্তিকে নির্দেশ করে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চা বা কফিকে নিজস্ব ভাবে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। IARC-এর মূল্যায়নে কফি সামগ্রিক ভাবে Group 3-তে ছিল, অর্থাৎ মানুষের ক্ষেত্রে ক্যান্সার ঘটায় কি না, সে বিষয়ে প্রমাণ যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে অত্যন্ত গরম পানীয়ের ক্ষেত্রে তাপমাত্রাকেই মূল উদ্বেগ হিসেবে দেখা হয়েছে।
তাই চা বা কফি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সদ্য ফুটন্ত অবস্থায় পান না করে কিছুটা ঠান্ডা করে পান করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে যে পানীয় মুখ বা জিভে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, সেটি নিয়মিত পান করার অভ্যাস এড়ানো উচিত। ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপানের মতো প্রতিষ্ঠিত ঝুঁকিগুলির পাশাপাশি পানীয়ের অতিরিক্ত তাপমাত্রার বিষয়টিও সচেতনতার সঙ্গে দেখা জরুরি।



