উৎসবের মরসুমে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ছ’দিনে ১২৭ জন রোগীর মৃত্যু ঘিরে চর্চা শুরু হয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবরের মধ্যে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। মৃতদের মধ্যে আটজন ভর্তির আগেই জরুরি বিভাগে মারা যান। গত বছর পুজোর পাঁচ দিনে এই হাসপাতালে ৭৭ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। ফলে এ বছর মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুজোর ছুটিতে চিকিৎসা পরিষেবা এবং সিনিয়র চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
তবে মৃত্যুর এই সংখ্যাকে অস্বাভাবিক বলে মানতে নারাজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার কৌশিক ঈশোরের দাবি, মৃতদের অধিকাংশই আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রেফার হয়ে এসেছিলেন। তাঁদের অনেকের শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। সেই কারণেই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে বলে তাঁর বক্তব্য।
গত বছরের তুলনায় বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা
হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পুজোর পাঁচ দিনে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে ৭৭ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। এ বছর ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর, অর্থাৎ ছ’দিনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৭-এ। এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর চিকিৎসক মহলের একাংশে প্রশ্ন উঠেছে, উৎসবের দিনগুলিতে হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন কি না।
পুজোর ছুটিতেও যাতে চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত না হয়, সে জন্য আগাম ডিউটি রোস্টার তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক সিনিয়র চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জুনিয়র চিকিৎসকদের অভিযোগ ঘিরে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
অভিযোগ, পুজোর ছুটির আগে জুনিয়র চিকিৎসকদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, নির্ধারিত ডিউটি সূচি মেনেই কাজ করতে হবে। কোনওভাবেই ডিউটি অদলবদল করা যাবে না বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি। কিন্তু সিনিয়র চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও একই রকম কড়াকড়ি বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পুজোর দিনগুলিতে চিকিৎসা পরিষেবায় কোনও ঘাটতি ছিল না।
নার্সিংহোম থেকে রেফার হয়েছিলেন গুরুতর অসুস্থ রোগীরা
হাসপাতাল সুপারের বক্তব্য, পুজোর সময় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে বিপুল সংখ্যক রোগীকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে রেফার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলিতে চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের এখানে পাঠানো হয় বলে দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
মেডিসিন বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল বলে জানা গিয়েছে। কিডনি ও লিভারের গুরুতর অসুখে আক্রান্ত রোগীদের পাশাপাশি স্ট্রোকে আক্রান্ত কয়েকজন রোগীকেও অন্য হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে রেফার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
সুপারের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোমেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও রোগীদের উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছিল। ফলে ইতিমধ্যেই সংকটজনক অবস্থায় থাকা রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হয়েছে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে।
কৌশিক ঈশোর বলেন, “চিকিৎসায় গাফিলতি হয়েছে বা রোগী মৃত্যুর ঘটনা অস্বাভাবিক, এমন অভিযোগ ঠিক নয়। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখেছি, মৃতদের অধিকাংশই পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে রেফার হয়ে এসেছিলেন।”
পুজোর দিনগুলিতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি এবং হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়েছেন সুপার। তাঁর বক্তব্য, উৎসবের দিনগুলিতেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা মিলিতভাবে পরিষেবা দিয়েছেন। চিকিৎসার অভাব কিংবা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় কোনও ত্রুটি ছিল না বলেই দাবি তাঁর।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আরও দাবি, পুজোর সময় পথ দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তাঁদের মতে, বিভিন্ন জায়গা থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের রেফার করে পাঠানোই মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তবে রেফার হয়ে আসা রোগীদের শারীরিক অবস্থা, মৃত্যুর কারণ এবং চিকিৎসার সময়সীমা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে না আসায় এই পরিসংখ্যান নিয়ে আরও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
উৎসবের আবহে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কিছুটা আনন্দ দিতে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সুপার। অষ্টমীর দিন রোগীদের জন্য খিচুড়ি, পায়েস, চাটনি ও পাপড় দেওয়া হয়। দশমীর দিন ছিল ভাত, মুরগির মাংস ও চাটনি।
তবে পুজোর ছ’দিনে ১২৭ জন রোগীর মৃত্যুর পর মূল প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে চিকিৎসা পরিষেবার প্রস্তুতি এবং অন্য হাসপাতাল থেকে রেফার হওয়া সংকটজনক রোগীদের চিকিৎসার পরিস্থিতি নিয়ে। মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ বুঝতে রোগীদের শারীরিক অবস্থা, রেফার করার সময় তাঁদের অবস্থা এবং হাসপাতালের ডিউটি রোস্টার—এই সব দিকের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য আপাতত চিকিৎসায় গাফিলতি বা পরিষেবার ঘাটতির অভিযোগ মানতে নারাজ।



