রাতে টানা আট ঘণ্টা ঘুমিয়েও সকালে ঘুমের ঘোর কাটছে না, শরীরে ক্লান্তি, কাজে মন বসছে না? এর পিছনে শুধু কম ঘুম নয়, মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ফলে বিছানায় পর্যাপ্ত সময় কাটালেও শরীর ও মস্তিষ্কের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নাও হতে পারে। তবে নিয়মিত ক্লান্তির পিছনে স্লিপ অ্যাপনিয়া, রক্তাল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে।
ঘুমের সময়ের হিসাব আর ঘুমের গুণমান এক বিষয় নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে, ঘুম অগভীর হলে কিংবা শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র ব্যাহত হলে সকালে সতেজ অনুভব নাও হতে পারে। অনেক সময় রাতে ঘুম ভাঙার কথা মনে না থাকলেও ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
মানসিক চাপ এই সমস্যার অন্যতম কারণ। কাজের চাপ, আর্থিক উদ্বেগ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় সতর্ক অবস্থায় রাখতে পারে। বিছানায় শুয়েও যদি মাথার মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরতে থাকে, তা হলে সহজে ঘুমিয়ে পড়া বা গভীর ঘুম বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা ও দিনের বেলায় ক্লান্তির সম্পর্ক রয়েছে।
এর প্রভাব শুধু সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে দিনের বেলায় মনোযোগ ধরে রাখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কাজের গতি বজায় রাখাও কঠিন হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে খিটখিটে মেজাজ, মাথা ভার লাগা কিংবা সারাদিন ঝিমুনির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তবে এই লক্ষণগুলি একাধিক কারণে হতে পারে; শুধু ক্লান্তি দেখে মানসিক চাপকেই একমাত্র কারণ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ঘুমের মান খারাপ হওয়ার পিছনে দৈনন্দিন অভ্যাসও ভূমিকা নিতে পারে। প্রতিদিন আলাদা সময়ে ঘুমোতে যাওয়া ও ওঠা, রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা, সন্ধ্যার পরে চা-কফি পান করা কিংবা ঘুমের আগে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। শোওয়ার ঘরে অতিরিক্ত আলো, শব্দ বা অস্বস্তিকর তাপমাত্রাও ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট করতে পারে।
তবে আট ঘণ্টা ঘুমিয়েও নিয়মিত ক্লান্তি অনুভব করলে শুধু জীবনযাত্রার অভ্যাসকে দায়ী করা উচিত নয়। অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (Obstructive Sleep Apnoea) এমন একটি সমস্যা, যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হতে পারে। জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসা বা হাঁসফাঁস করে ওঠা, সকালে মাথাব্যথা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া এই সমস্যার সতর্কসংকেত হতে পারে।
এ ছাড়াও রক্তাল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবিটিস, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির সম্পর্ক থাকতে পারে। কোন কারণটি দায়ী, তা নির্ধারণ করতে উপসর্গের ধরন, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ঘুমের মান উন্নত করতে কয়েকটি অভ্যাস সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়া ও ওঠার চেষ্টা করুন। শোওয়ার আগে কাজের চাপ ও মোবাইল ব্যবহারের সময় কমিয়ে শান্ত হওয়ার জন্য কিছুটা সময় রাখুন। বিকেল বা সন্ধ্যার পরে ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো এবং শোওয়ার ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখাও উপকারী হতে পারে। মানসিক চাপ সামলাতে নিয়মিত শরীরচর্চা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা ধ্যানের মতো অভ্যাসও সহায়ক হতে পারে। তবে এগুলি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
পর্যাপ্ত ঘুমের পরেও যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লান্তি থাকে, দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হয় কিংবা নাক ডাকা, শ্বাস আটকে আসা বা অতিরিক্ত দিনের ঘুমের মতো লক্ষণ দেখা যায়, তা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ঘুমের সময় বাড়ানোই সব সময় সমাধান নয়—কেন বিশ্রাম নিয়েও শরীর সতেজ হচ্ছে না, তা খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ।



