বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পটেকরের (Nana Patekar) আকস্মিক মৃত্যু ফের সামনে এনেছে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং হার্ট অ্যাটাক—এই দুই শব্দের পার্থক্য। প্রাথমিক চিকিৎসা-তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর গোয়ায় নিজের বাড়িতে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় অভিনেতাকে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর (CPR) দেওয়া হলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
অনেকেই দৈনন্দিন কথাবার্তায় হার্ট অ্যাটাক এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে একই সমস্যা মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে দু’টি এক নয়। হার্ট অ্যাটাক মূলত হৃদ্যন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বন্ধ বা কমে যাওয়ার সমস্যা, আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের গোলযোগে হঠাৎ পাম্পিং বন্ধ হয়ে যায়।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সাধারণত করোনারি ধমনিতে বাধা তৈরি হয়। ফলে হৃদ্পেশির কোনও অংশে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছতে পারে না। যত বেশি সময় রক্তপ্রবাহ বন্ধ থাকে, তত বেশি হৃদ্পেশির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্যন্ত্র হঠাৎ কার্যকর ভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। এর অন্যতম কারণ হতে পারে গুরুতর অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন বা arrhythmia। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়তে পারেন এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে অত্যন্ত জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হয়। একজন ব্যক্তি হঠাৎ পড়ে গেলেন, সাড়া দিচ্ছেন না এবং স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিচ্ছেন না—এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা ডেকে CPR শুরু করা এবং সম্ভব হলে AED ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হার্ট অ্যাটাকের চিত্রটি কিছুটা আলাদা। বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা বা ব্যথা, ব্যথা হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা উপরের পেটে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি—এগুলির মধ্যে এক বা একাধিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সব রোগীর ক্ষেত্রে একই লক্ষণ থাকবে, এমনও নয়।
বিশেষ করে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—হার্ট অ্যাটাক হলেই যে সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে, তা নয়। তবে হার্ট অ্যাটাক থেকে পরবর্তী সময়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। অর্থাৎ দু’টি আলাদা শারীরবৃত্তীয় সমস্যা হলেও তাদের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ক্ষেত্রে লক্ষণ অনেক বেশি আকস্মিক। হঠাৎ জ্ঞান হারানো, কোনও সাড়া না দেওয়া, স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শুধু অস্বাভাবিক ভাবে হাঁসফাঁসের মতো শ্বাস নেওয়া—এগুলিই প্রধান সতর্ক সংকেত। এমন অবস্থায় অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় মস্তিষ্ক-সহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছনো বন্ধ হয়ে যায়। তাই সময় এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। CPR হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না, তবে জরুরি চিকিৎসা ও defibrillation পৌঁছনোর আগে মস্তিষ্কে কিছুটা রক্তপ্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
নানা পটেকরের মৃত্যু সেই কারণেই সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য-সচেতনতার বিষয়ও সামনে এনেছে। ‘হার্ট অ্যাটাক’ এবং ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ একই ঘটনা নয়—কিন্তু দু’টির ক্ষেত্রেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনও ব্যক্তির বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ অচেতন হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে কারণ নির্ধারণ না করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।



