চোরবাগান পদপিষ্ট-কাণ্ডে দায় কার, খুঁজতে তিন মাস সময়! ‘যথেষ্ট নয়’, জানালেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

চোরবাগান দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত সিট তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ভূমিকা খতিয়ে দেখে দায় নির্ধারণ করা হবে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

উত্তর কলকাতার চোরবাগান দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায় নির্ধারণের তদন্ত শুরু করতে চলেছে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)। তদন্তের নেতৃত্বে রয়েছেন কলকাতা হাই কোর্টের (Calcutta High Court) অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। রাজ্য সরকার তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিলেও, এত বড় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য সেই সময় যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা করবে দল।

১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন আরও ২৫ জন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের ভিড় কীভাবে প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে পরিণত হল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে ছ’সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল। ঘটনার পিছনে অতিরিক্ত ভিড়, প্রবেশ ও বেরনোর পথের সমস্যা, নিরাপত্তার ঘাটতি কিংবা প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

বৃহস্পতিবার তদন্তের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অনিন্দিতা রায় সরস্বতী জানান, সিটের সদস্যরা শীঘ্রই বৈঠকে বসে তদন্তের রূপরেখা তৈরি করবেন। তার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে। তিন মাসের সময়সীমাকে সংক্ষিপ্ত বলেই মনে করছেন তিনি। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

রাজ্য সরকারের নির্দেশে গঠিত এই সিটের কাজ শুধু পদপিষ্ট হওয়ার তাৎক্ষণিক কারণ চিহ্নিত করা নয়। ঘটনার আগে মণ্ডপে কত মানুষের সমাগম হয়েছিল, ভিড়ের চাপ কোন জায়গায় বাড়তে শুরু করে এবং কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তা পুনর্গঠন করা হবে। বৃষ্টির প্রভাব, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, গুজব, মাইকে ঘোষণা, আচমকা মানুষের চলাচল এবং আতঙ্ক ছড়ানোর মতো সম্ভাব্য কারণও তদন্তের আওতায় থাকবে।

মণ্ডপের প্রবেশপথ, বেরনোর রাস্তা, গেট, ব্যারিকেড, সিঁড়ি ও জরুরি নির্গমন ব্যবস্থার পর্যাপ্ততা খতিয়ে দেখা হবে। দর্শনার্থীর সংখ্যা মণ্ডপের নিরাপদ ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা কার্যকর ছিল কি না, তাও যাচাই করা হবে।

তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনে তোলা ভিডিয়ো, ফরেনসিক রিপোর্ট, কল রেকর্ড, পুলিশ স্টেশন ও কন্ট্রোল রুমের নথি এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করা হবে। পুজো উদ্যোক্তা, পুলিশ, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, দমকল, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা, হাসপাতাল এবং পুরসভার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। কারও গাফিলতি বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপের সুপারিশ করবে সিট।

তদন্তের নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি থাকলেও দলের বাকি সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা ও অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের প্রধান সচিব, স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের শীর্ষ পুলিশ আধিকারিক, রাজ্য পুলিশের ডিজির মনোনীত উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের প্রতিনিধি এবং কলকাতায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (NDRF) প্রতিনিধি।

চোরবাগান-কাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি ভবিষ্যতে উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকায় বড় পুজো ও জনসমাগমের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়েও সুপারিশ করার দায়িত্ব রয়েছে সিটের। নিরাপদ দর্শনার্থী ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, পর্যাপ্ত প্রবেশ ও নির্গমন পথ, সিসিটিভি নজরদারি, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মানুষ সরানোর ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর মতো বিষয় বিবেচনা করা হবে।

এই তদন্তে ১৯টি মৃত্যুর দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দেওয়া আর্থিক সাহায্য ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হবে। এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য, ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করে কোথায় কী ব্যর্থতা ঘটেছিল, তা নির্দিষ্ট করা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর