ফ্যাটি লিভার কি পুরোপুরি সেরে যায়? সুস্থ থাকতে জীবনযাপনে আনুন এই পরিবর্তন

অতিরিক্ত ওজন, অনিয়ন্ত্রিত রক্তে শর্করা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে জীবনযাত্রার পরিবর্তনে লিভারের চর্বি কমানো সম্ভব, তবে ফল নির্ভর করে রোগের তীব্রতার উপর।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার বা যকৃৎ। খাবার হজমে সাহায্য করা, বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান প্রক্রিয়াকরণ, প্রোটিন তৈরি এবং শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই অঙ্গ। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং বিপাকীয় সমস্যার কারণে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

শুধু মদ্যপানের কারণেই ফ্যাটি লিভার হয়, এই ধারণা ঠিক নয়। মদ্যপান না করলেও অতিরিক্ত ওজন, টাইপ-২ ডায়াবিটিস, রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতায় সমস্যা থাকলে এই রোগ দেখা দিতে পারে। বর্তমানে বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভারকে MASLD বা Metabolic Dysfunction-Associated Steatotic Liver Disease বলা হয়।

তবে আশার কথা, প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই লিভারে জমা চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা ধীরে ধীরে কমানো, খাবারের ধরন বদলানো এবং নিয়মিত শরীরচর্চা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু লিভারে প্রদাহ বা ফাইব্রোসিস অর্থাৎ ক্ষত তৈরি হয়ে গেলে শুধু জীবনযাত্রা বদলালেই সব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থতা ফিরে আসে না।

ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই রকম ফল পাওয়া যায় না। কারও লিভারে শুধুমাত্র চর্বি জমে, আবার কারও ক্ষেত্রে সেই চর্বির সঙ্গে প্রদাহ ও টিস্যুর ক্ষত তৈরি হতে পারে। রোগের পর্যায়, শরীরের ওজন, ডায়াবিটিস, কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার উপর নির্ভর করে চিকিৎসার ফল।

প্রাথমিক পর্যায়ে লিভারে স্থায়ী ক্ষত তৈরি না হলে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে লিভারের চর্বি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রদাহ থেকে ফাইব্রোসিস বা সিরোসিস তৈরি হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। তাই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে উপসর্গের অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শে রোগের পর্যায় নির্ণয় করা জরুরি।

আর একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, লিভার বড় হয়ে গেলেই শুধু ফ্যাটি লিভার বোঝা যায় না। অনেকের ক্ষেত্রে কোনও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। আল্ট্রাসাউন্ড, রক্তপরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক লিভারের অবস্থা মূল্যায়ন করেন।

লিভারের চর্বি কমাতে কতটা ওজন কমানো দরকার?

অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর উপায়। চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী, শরীরের মোট ওজনের অন্তত ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারে জমা চর্বি কমতে সাহায্য করতে পারে। প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসের উন্নতির জন্য অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি ওজন কমানোর প্রয়োজন হয়। তবে এই লক্ষ্য ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও রোগের পর্যায় অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

ধরা যাক, কারও ওজন ৮০ কেজি। তাঁর ক্ষেত্রে মোট ওজনের ৫ শতাংশ কমানোর অর্থ প্রায় ৪ কেজি ওজন কমানো। তবে দ্রুত ওজন কমানোর জন্য দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা, কঠোর ডায়েট করা বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসের মাধ্যমেই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশি কার্যকর।

ফ্যাটি লিভার হলে খাবারের তালিকায় কী রাখবেন?

ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে খাবারের গুণমান ও পরিমাণ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, গোটা ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম এবং পরিমিত পরিমাণে মাছ রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও রাখা যায়।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, প্যাকেটজাত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং পরিশোধিত শর্করার ব্যবহার কমানো দরকার। বিশেষ করে চিনিযুক্ত কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত মিষ্টি চা-কফি নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা বদলানো উপকারী হতে পারে। স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট বেশি রয়েছে, এমন খাবারও সীমিত করা উচিত।

শুধু লেবু, বেরি বা কোনও একটি বিশেষ খাবার খেলেই লিভারের চর্বি গলে যায়, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লিভার সুস্থ রাখার নামে বাজারে পাওয়া তথাকথিত ডিটক্স পানীয় বা হার্বাল সাপ্লিমেন্টও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।

নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা কেন জরুরি?

শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্য ব্যায়াম লিভারে চর্বি কমাতে সাহায্য করতে পারে। ইউরোপীয় চিকিৎসা নির্দেশিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে ১৫০ মিনিটের বেশি মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শারীরিক সক্ষমতা ও অন্যান্য রোগের কথা মাথায় রেখে ব্যায়ামের ধরন বেছে নেওয়া প্রয়োজন।

একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন না, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অল্প সময় হাঁটা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন। ওজন খুব বেশি না কমলেও শরীরচর্চা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে।

ডায়াবিটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন

ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাওয়া এবং অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু লিভারের চর্বি কমানোর দিকে নজর দিলেই হবে না। রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রাও নিয়মিত পরীক্ষা করে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে ফলো-আপ করা জরুরি। নিজে থেকে কোনও ওষুধ বন্ধ করা বা লিভার পরিষ্কারের দাবি করা বিকল্প চিকিৎসা শুরু করা উচিত নয়।

মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করা দরকার। লিভারের রোগের পর্যায় অনুযায়ী মদ্যপান সম্পূর্ণ বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে উন্নত পর্যায়ের ফাইব্রোসিস বা সিরোসিস থাকলে অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

আল্ট্রাসাউন্ডে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে বা লিভারের রক্তপরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফল এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী লিভারের ক্ষত বা ফাইব্রোসিসের ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে অতিরিক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে। ফ্যাটি লিভার থাকলেও লিভারের ক্ষতির মাত্রা সব সময় সাধারণ রক্তপরীক্ষা থেকে বোঝা যায় না।

চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, পেট ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত বা বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ধারাবাহিকতা। এক সপ্তাহের ডায়েট বা কয়েক দিনের ব্যায়ামে স্থায়ী ফল পাওয়ার আশা না করে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। রোগের পর্যায় বুঝে চিকিৎসা, সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং বিপাকীয় সমস্যার নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি বিষয়ই লিভারের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। ব্যক্তিগত রোগনির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন