হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও স্ট্রোকের পার্থক্য কী? চিনুন বিপদের লক্ষণ

হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হওয়া, হঠাৎ হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যকারিতা থেমে যাওয়া এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার লক্ষণ আলাদা। জরুরি অবস্থায় কী করবেন, জেনে নিন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও স্ট্রোক—তিনটি আলাদা জরুরি চিকিৎসার পরিস্থিতি। কিন্তু লক্ষণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকেই একটির সঙ্গে অন্যটিকে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ কোন অবস্থায় কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়, তা দ্রুত বুঝতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হার্ট অ্যাটাকে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাভাবিক স্পন্দন ও রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং স্ট্রোকে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয় অথবা রক্তনালি ফেটে যায়। তিন ক্ষেত্রেই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কি একই?

না, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অবস্থা। হার্ট অ্যাটাক মূলত রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা, আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট সাধারণত হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় গোলযোগের কারণে ঘটে। তবে হার্ট অ্যাটাক থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক কী? কোন লক্ষণগুলি চিনবেন?

হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য করোনারি ধমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনও ধমনিতে বাধা তৈরি হলে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশিতে রক্ত সরবরাহ কমে যেতে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলে সেই পেশির ক্ষতি হয়। এই অবস্থাকেই হার্ট অ্যাটাক বলা হয়।

হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে বুকে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি। ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে এক বা দুই হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পেটের দিকে। পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

সব সময় তীব্র বুকব্যথা দিয়েই হার্ট অ্যাটাক শুরু হয় না। কারও ক্ষেত্রে লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে, আবার কিছুক্ষণ কমে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসতে পারে। তাই উপসর্গ কমে যাওয়ার অপেক্ষা করে চিকিৎসা নিতে দেরি করা বিপজ্জনক।

কী করবেন? হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন। ব্যক্তিকে হাঁটাচলা করিয়ে বা নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার বদলে অ্যাম্বুল্যান্সের সাহায্য নেওয়া ভালো। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া নতুন করে ওষুধ খাওয়াবেন না।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কী? কেন এত বিপজ্জনক?

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদ্‌যন্ত্রের আকস্মিক ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে হৃদ্‌যন্ত্র কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতে গোলযোগ থেকে বিপজ্জনক অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন তৈরি হয়।

এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হল হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়া, ডাকলে বা স্পর্শ করলে সাড়া না দেওয়া এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নেওয়া। কখনও ব্যক্তি শুধু হাঁপানোর মতো অনিয়মিত শ্বাস নিতে পারেন, যা স্বাভাবিক শ্বাস নয়।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আগে কারও বুকে অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরা হতে পারে। আবার কোনও স্পষ্ট সতর্কসংকেত ছাড়াও এটি ঘটতে পারে।

কী করবেন? কেউ হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি পরিষেবায় ফোন করুন। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সন্দেহ হলে বুকের মাঝখানে জোরে ও দ্রুত চাপ দিয়ে সিপিআর (CPR) শুরু করুন। প্রশিক্ষণ না থাকলে জরুরি পরিষেবার ফোন-পরিচালকের নির্দেশ অনুসরণ করুন। কাছে AED বা স্বয়ংক্রিয় বহিঃস্থ ডিফিব্রিলেটর থাকলে সেটি চালু করে নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করুন।

স্ট্রোক কী? শরীরের কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন?

স্ট্রোক হয় যখন মস্তিষ্কের কোনও অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ ঘটে। প্রথম ক্ষেত্রে সাধারণত ইস্কেমিক স্ট্রোক এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে হেমোরেজিক স্ট্রোক হয়।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে হঠাৎ শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, মুখের এক দিক বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা কথা বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। এছাড়া আচমকা দৃষ্টির সমস্যা, ভারসাম্য হারানো, হাঁটতে অসুবিধা বা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও সতর্কসংকেত হতে পারে।

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট করা চলবে না। উপসর্গ কয়েক মিনিটের মধ্যে কমে গেলেও চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনো জরুরি, কারণ স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা আলাদা এবং কিছু চিকিৎসা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুরু করা প্রয়োজন।

তিনটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্য একনজরে

বিষয় হার্ট অ্যাটাক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট স্ট্রোক
মূল সমস্যা হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহে বাধা হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যকর স্পন্দন ও রক্ত পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে বাধা বা রক্তক্ষরণ
প্রধান লক্ষণ বুকের চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘাম হঠাৎ অচেতন, স্বাভাবিক শ্বাস নেই মুখ বেঁকে যাওয়া, এক হাত দুর্বল, কথা জড়ানো
জরুরি পদক্ষেপ দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স ও চিকিৎসা জরুরি সাহায্য, অবিলম্বে CPR ও AED অবিলম্বে হাসপাতালে পৌঁছনো

কোন ভুলগুলি এড়ানো জরুরি?

প্রথম ভুল হল, বুকের ব্যথা নিজে থেকেই কমে যাবে ভেবে অপেক্ষা করা। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব সময় একই রকম হয় না। তাই সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

দ্বিতীয় ভুল হল, অচেতন ব্যক্তির শ্বাস স্বাভাবিক কি না যাচাই না করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা। ব্যক্তি সাড়া না দিলে এবং স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আশঙ্কা ধরে জরুরি সাহায্য ডাকতে হবে এবং প্রশিক্ষণ অনুযায়ী সিপিআর শুরু করতে হবে।

তৃতীয় ভুল হল, স্ট্রোকের লক্ষণ সাময়িকভাবে কমে গেলে বিপদ কেটে গিয়েছে বলে ধরে নেওয়া। মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত দুর্বল হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?

ধূমপান এড়িয়ে চলা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ওজন ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।

পরিবারে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে বা আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অন্য কোনও হৃদ্‌রোগ থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলেও সব জরুরি পরিস্থিতি সম্পূর্ণ এড়ানো যায় না। তাই লক্ষণ চেনা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার প্রস্তুতি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখবেন: হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও স্ট্রোকের লক্ষণ আলাদা হলেও তিনটিই সময়-সংবেদনশীল জরুরি অবস্থা। লক্ষণ দেখা দিলে নিজে রোগ নির্ণয় করার চেষ্টা না করে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিন।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন